তারিখ : এপ্রিল ১৪, ২০১৯

 

রাজশাহীর ওয়েদারে যে ব্যক্তি ১ দিন টিকে থাকতে পারবে, সে পৃথিবীর যেকোনো ওয়েদারে এমনকি মংগলগ্রহেও সহি সালামতে এক বছর বসবাস করতে পারবে, একথা আমরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই জেনেছি।

 

তাই রাজশাহীর ওয়েদারের বর্তমানে কি অবস্থা সেটা সরেজমিনে দেখতে গত ১৪ই এপ্রিল ভালোবাসা দিবস থুক্কু বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে আমি আর রানা ভাই রাজশাহীতে যাই।

 

সকালে রাজশাহী স্টেশনে নেমে, বন্ধু শুভ’র বাসা। শুভ আমাদের সাথেই ট্রেনে এসেছে, ওর বাড়ি রাজশাহী।  শুভ’র বাড়িতে গিয়ে ছাদে বসে চারপাশের পাখি পর্যবেক্ষণ করতে থাকলাম আর সাথে রানা ভাইয়ের পছন্দের কিছু রবীন্দ্রসংগীত শুনলাম। আকাশের মন খারাপ, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল সারাদিন এরকম মেঘলাই বোধহয় থাকবে। শুভ’র বাসায় খাওয়াদাওয়া করে হালকার উপর ঝাপসা একটা ঘুম দিয়ে প্রায় এগারোটার দিকে বের হলাম পদ্মা নদীর নাব্যতা পরীক্ষা করতে। ততক্ষনে আকাশের মুখে হাসি ফুটেছে, আর আমাদের গায়ে উঠেছে ঘাম।

 

শুভর বাড়ির ছাদে

 

গিয়ে দেখলাম পদ্মা নদী থেকে ট্রাক ট্রাক বালি তুলে নেয়া হচ্ছে। এটা দেখে আমাদের মাথা গরম হয়ে গেল। তাই নিজেদের গরম মাথা ঠান্ডা করার জন্য পদ্মায় ডুব দিলাম। ঘন্টাখানিক পদ্মার ঠান্ডা পানিতে দাপাদাপি শেষে কিছু চ্যালেঞ্জিং পোজ দিয়ে ফটোশুটও করলাম।

 

রানা ভাইয়ের ফ্রেমিং সেন্স খারাপ হওয়াতে তাকে বার বার হাতে-কলমে ছবি তোলার একশো দুইটি কৌশল শেখাতে হলো। কিন্তু তারপরো তিনি আমার কথা রাখলেন না, রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।

 

যাহোক, সেমি-ন্যুড এন্ড লুংগি-ফটোগ্রাফি শেষ করে আমরা ‘বৈশাখী হোটেলে’ নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ইলিশের বদলে গরুর মগজ আর হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খেলাম এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রখলাম। খাওয়া শেষে রানা ভাইয়ের টকদই খাওয়ার বাতিক উঠলো, কিন্তু টক দই না পেয়ে মিস্টি দই খেয়েই সে যাত্রায় কাজ চালিয়ে নিলাম।

 

এদিকে অফিস থেকে সঞ্জয় দা তাড়া দিচ্ছে কেন আমরা তাকে ক্যাম্পাসের ছবি পাঠাচ্ছি না। কি আর করা! আমরা তীব্র গরম উপেক্ষা করে রাবি ক্যাম্পাসে গিয়ে মুখে চুনকাম করা নারীদের দেখে বিরক্ত হতে থাকলাম। শেষে ছবি তোলার আন্তর্জাতিক কোনো অবজেক্ট খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়ে দুই একটা গাছের ছবি তুলে সঞ্জয় দা’কে না পাঠিয়েই  বিনোদপুরে এসে নাটোরগামী বাস ধরলাম।

 

রাজশাহীর ইয়েমার্কা গরমে রানা ভাই ঘামতে ঘামতে শেষ আর আমিও হাসফাস করছি। সকাল থেকে নানা কারণে মেজাজটাও বিলা হয়ে আছে। আমরা সিদ্ধান্তে আসলাম যে রাজশাহীতে যথেষ্ট ‘চ্যালেঞ্জিং টাইম’ কাটানো হয়েছে, এবার যাওয়া যাক নাটোরের দিকে, দেখা যাক সেখানে আবহাওয়া ও জলবায়ুগত কি কি পরিবর্তন এসেছে।

 

নাটোর যেতে এক ঘন্টা মতো লাগল। বাইপাস রোডে নেমে একটা সিএনজিওয়ালাকে বললাম, হালতি বিল যাবা? সে বলল, যাব, ভাড়া ৫০০ টাকা। ৫০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা চাওয়াতে বুঝলাম নাটোর থেকে পাবনার দূরত্ব খুব বেশি না, আর এদিকে বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবে সিএনজিওয়ালাদের মানসিক বিকৃতি ঘটেছে। যাহোক, রানা ভাই খানিকটা উত্তেজিত হয়ে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা শুরু করতে গেলে আমি তাকে থামিয়ে, একটা অটো ধরে মাদ্রাসা মোড় চলে এলাম। এখান থেকে সুলভ মূল্যে সিএনজি করে পাটুল বাজার পার হয়ে হালতি বিল।

 

হালতি বিলের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা

 

হালতি বিলের চারিদিকে এখন ধানক্ষেত। কাঁচাপাকা ধানক্ষেত দেখতে দেখতে আমরা সময়  কাটালাম। তবে এখানেও যথেষ্ট গরম, যার প্রভাব এলাকার চাচা মিয়াদের মাথায় পড়েছে।  এক চাচা মিয়া রানা ভাইকে জিজ্ঞেস করলো, সে এখানে কেন এসেছে। রানা ভাই বলল যে, আমরা ঘুরতে এসেছি। কিন্তু চাচা মিয়ার সে উত্তর পছন্দ হলো না, সে বলল ঘুরতে নাকি কোনো মতলব আছে?  আমি বুঝলাম চাচা মিয়ার বাসায় বোধহয় বিবাহযোগ্য কন্যার সংখ্যা অত্যধিক, তবুও সেসব অপ্রিয় প্রসংগ এড়িয়ে কিছু না বলে আমরা চলে এলাম।

 

রাস্তায় এক কৃষক ভাইয়ের কাছ থেকে একটা কাঁচা ভুট্টা চেয়ে নিলাম আমরা। সেটা হাতে নিয়ে রানা ভাইয়ের নতুন বাতিক শুরু হলো। তিনি ভুট্টা খেতে খেতে কবিতা আবৃত্তি করবেন আর আমাকে তা ভিডিও করতে হবে, কারণ এটা নাকি, তার ভাষ্য মতে, একটা ইউনিক কাজ হবে। কি আর করব, বড় ভাইয়ের আবদার পালন করতে আমি ইউনিকভাবে তার হাঁটতে হাঁটতে ভুট্টা খাওয়া আর কবিতা আবৃত্তির ভিডিও করলাম। এতে করে আশেপাশের দু’একজন যেভাবে তাকাচ্ছিল তাতে মনে হলো তারা বলাবলি করছে – এই পাগলছাগল দুইটা কই থেকে আসলো !!!

 

মহিষ ও মানুষের জীবন

 

পাগলামি করতে করতে পড়ন্ত বিকেল। রানা ভাইকে বললাম, রানা ভাই মাত্র সাড়ে তিন কিলো রাস্তা, বিলের ভেতর এই রাস্তা ধরে হেঁটেই যাব কি বলেন ! রানা ভাই প্রথমেই শুরু করলেন নিরাপত্তাহীনতা জনিত উদ্বেগের কথা, তাছাড়া গরমে এত পথ হাঁটতে তার মন চাচ্ছে না, হেনাতেনা ইত্যাদি। কিন্তু আমি তার কোনো কথাকেই গুরুত্ব না দিয়ে বেচারাকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেলাম। স্পিকারে গান ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় সন্ধ্যা পেরিয়ে চারপাশ সব আঁধার হয়ে গেল।

আমরা রাস্তার পাশে একজায়গায় বসলাম। এরই মধ্যে আকাশে চাঁদ উঠে গেছে, চাঁদের আলো পড়ছে বিলের ধানক্ষেতে। মাঝখানের রাস্তাটা যেন সাপের মত শুয়ে আছে। আমরা চাঁদের আলো গায়ে মেখে নিলাম। তারপর সেখান থেকে নাটোর, নাটোর থেকে আবার রাজশাহী। রাজশাহীতে এসে রাতের খাবার খেয়ে রাত ১২.১৫ এর গাড়িতে উঠলাম।

এভাবেই রাজশাহীতে একদিনের চ্যালেঞ্জিং টাইম পার করে বাসে করে ঘুমাতে ঘুমাতে পরদিন জঞ্জালে ভরা ঢাকা শহরে এলাম।

রানা ভাই, দুইজন লোক, ও আমি

 

পদ্মার চরে ‘ডিফিকাল্ট এঙ্গেলে’ তোলা ছবি

 

রানা ভাই মোবাইলে গানের লিরিক দেখতে ব্যস্ত

 

Leave a Reply