তারিখঃ ২৬ শে মার্চ ২০১৯

 

আমার স্মৃতি শক্তি দিন দিন হিমাংকের নিচে চলে যাচ্ছে, তাই লালাখাল ভ্রমণের দিনটি নিয়ে কিছু কথা লিখে রাখা ভালো।

 

২৬ শে মার্চ ২০১৯, স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে সিলেটে এসেছি। সকাল সাড়ে পাঁচটায় সিলেট স্টেশনে নেমেই দেখলাম এক ছেলে তার মায়ের উপর মন খারাপ করছে কারণ তার মা ভুলে ল্যাপটপের চার্জার আনেননি। একজন মায়ের করুণ মুখ দেখে দিন শুরু হলো।

 

স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে এলাম সুরমা নদীর ধারে। ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটছে, আর সেই সাথে শহরটাও আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে শুরু করেছে। আকাশে দু’চারটা পাখি দিকশূন্য হয়ে ঘুরছে। দু’জনকে দেখলাম নৌকা করে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে।

 

আমি ক্বীন ব্রিজ আর সুরমা নদীর ছবি ক্যামেরাবন্দী করতে করতে সকালের টাটকা হাওয়া মেখে নিলাম শরীরে। তারপর ধীরলয়ে হাঁটতে হাঁটতে তালতলা ভিআইপি রোড, যেখানে গতবার উঠেছিলাম হোটেল দ্য ইস্ট এন্ড নামের একটা হোটেলে, কিন্তু এবার দেখি সেটা বন্ধ। তাই পাশের হোটেল বিলাসে একটা ডাবল বেডের রুম নিলাম, যাতে করে পা ছড়িয়ে আরামে থাকতে পারি।

 

স্বাধীনতা দিবসে ‘শহীদ মিনারে ফুল’

 

ট্রেনে ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় হোটেলে উঠে গোসল সেরে একটা মিনি সাইজের ঘুম দিয়ে নিলাম। তারপর বারোটার দিকে উঠে সিলেটের রাস্তায় রাস্তায় এলোমেলো হেঁটে একসময় সারিঘাট যাওয়ার লেগুনায় উঠে পড়লাম ধোপাদিঘীরপাড় থেকে। উদ্দেশ্য লালাখালের বর্ণিল পানিতে নৌকাভ্রমণ। যাওয়ার পথটা ছিল সুন্দর, বিশেষ করে যখন রাস্তার দুধারে বিস্তীর্ণ মাঠ বা বিল দেখা যাচ্ছিল তখন।

 

সারিঘাট পৌছুতে দুপুর ৩ টার কিছু বেশি বাজল। আমি লেগুনা থেকে নেমে হাতমুখ মুছে সারি নদীর পাড় ধরে হাটতে থাকলাম। দেখলাম কয়েকটি ছেলে, আমার বয়সিই হবে, বালি তুলে নৌকা থেকে মাথায় বয়ে নিয়ে পাড়ে ওঠাচ্ছে। মোবাইলে ছবি তুলছি দেখে ওদের একজন হাসিমুখে আমার কাছে এলো সেলফি তুলবে বলে। আমিও টুকটাক কথা বলে, সেলফি তুলে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। নদীতে অল্প কিছু নৌকা তখন পানির ওপরে শুয়ে আছে। দু একটা নৌকা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সামনের বাঁকে। পাড়ে একটা নৌকা মেরামতের কাজ করছে দু তিনজন, যাদের একজন আবার একটা কৌটায় আলকাতরা গরম করছে।

 

তো মোটের উপর এই হলো জীবন, কেউ গভীরভাবে এনগেজড হয়ে আছে আর কেউ সেটাকে অতিক্রম করে উপর থেকে এনগেজমেন্টটা বোঝার চেষ্টার করছে।

 

একসময়  নদীর পাড় ছেড়ে উপরে উঠে দেখি তরমুজ বিক্রি হচ্ছে রাস্তার পাশে লাইন ধরে। খাবারের প্রতি আমার অনাগ্রহ থাকায় আমি তরমুজ এড়িয়ে অন্য একটা দোকানে ঢুকে মোবাইল রিচার্জ করার ছলে টাকা ভাংতি করে নিলাম।

 

আমি ঢাকা থেকে এসেছি শুনে তিনি বললেন, ঢাকায় তো শুধু মারামারি। আমাদের এখানে ওসব কিছু নেই। এখানে রাতের বেলা টাকাপয়সা নিয়ে হেঁটে বেড়ালেও কেউ আপনার কিছু করবে না। আমি বিস্ময় প্রকাশ করে, হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম, তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলাম একটা অটোরিকশার খোঁজে।

 

সামনের ব্রিজ পার হয়ে ডানে গেলেই অটো পাব, এমন নির্দেশনা পেয়ে ব্রিজ পার হলাম। একা একা ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছি। মাঝে মধ্যে দু একটা গাড়ি যাচ্ছে শা শা করে। আর আমার ব্যাগের সাইড পকেট থেকে স্পিকারে ভেসে আসছেন রবীন্দ্রনাথ, বলছেন, কতোবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া….

 

আমি তো নিজেকে ভুলতে পারিনা, আমার সে ক্ষমতা নেই যদিও জানি সেল্ফলেসনেস ইজ দ্য গ্রেটেস্ট এচিভমেন্ট ইন লাইফ, তবুও এইসব আত্মমগ্ন মুহুর্ত অতুলনীয়।  কারণ জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি বুঝে গেছি যে আমার জীবন কি হবে, আমি কোন দিকে এগোচ্ছি, কেন এবং কি চাই আর কতটুকু না পেলে আমি আহত হই;  সব হিসাব করা আছে।

 

তবু আমার চিন্তাকে ধারণ করার মতো কারো সাথে আমার পরিচয় হবে না একথা নিশ্চিত জেনেও কখনো কখনো বিপদজনক হয়ে উঠি আমি। চিরকালই অমিমাংশিত সম্পর্কের প্রতি প্রবল ঝোক আমার। তবে কোনো রিগ্রেট নেই, কারণ জীবন এভাবেই সুন্দর।

 

সারটেইন এমাউন্ট অফ রিস্ক এন্ড ম্যাডনেস যাদের মধ্যে নেই, যাদের জীবন ক্যাপিটালিস্ট ক্যালকুলেটারে জমা-খরচের হিসেবে বন্দী তাদের বেঁচে থাকা শুধু পৃথিবীতে মানুষের প্রজন্ম টিকিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছু নয়, এটাই আমি সত্য বলে মনে করি। আমি সময়কে আর সময়ে যারা আমার হাত ধরে থাকে তাদেরকে গুরুত্ব দিই, কারণ সময় গেলে সাধন হয় না।

 

এসব ভাবতে ভাবতে আমি নিজেকে ভুলতে চেয়েও না পেরে বরং একটা অটোরিকশা পেয়ে তাতে উঠে পড়লাম। যাত্রি আর কেউ না থাকায় বাধ্য হয়ে রিজার্ভ করে নিয়ে ছুটলাম লালাখালের দিকে।

 

অটোচালকের নাম আলিম। তার মুখে কালো দাড়ি, মাথায় টুপি, গায়ে পাঞ্জাবি। তিনি মোটামুটি ভালো আছেন, যদিও এই ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলতে তার এবং তার মতো আরো অন্য চালকদের খুব কষ্ট করতে হয়।

 

অটোরিকশা চালক আলিম ভাই

 

অটোতে করে যাওয়ার সময় ছোট একটা এক্সিডেন্ট হলো। বাম দিকের শাখা রাস্তা থেকে একটা মোটরবাইক সামনে এসে পড়ায় আলিম ভাই সামলাতে না পেরে বেশ একটা ধাক্কা লাগিয়ে দিলেন। অটো উলটে গেলে খুব খারাপ কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল অবশ্য। কিন্তু হলো না। আমি ভাবলাম, তাহলে জীবন এরকমই তুচ্ছ, এটাকে এতো গুরুত্ব দেয়ার কি আছে!

 

প্রায় ৪ টার কিছু পরে আমি লালাখালে পৌছালাম। অটোওয়ালা আলিম ভাইয়ের নাম্বার নিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নৌকা খুঁজতে ঘাটে এলাম। কিন্তু এসে দেখি এখানে কোনো খেয়া নৌকা নেই, সবই ইঞ্জিনের নৌকা। খালপথে ভটভট ইঞ্জিনের শব্দ অপ্রিয় হলেও উপয়ান্তর না পেয়ে একটা নৌকা রিজার্ভ করলাম, যেহেতু আমি একাই যাব। নৌকাওয়ালার নাম নজরুল। কিছুক্ষনের মধ্যে তার সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলাতে তিনি আমাকে কিছুটা বেশি সময় ঘুরিয়ে নিয়ে আসবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন।

 

নজরুল ভাইয়ের নৌকার নড়বড়ে ছাদে উঠে বসলাম। তারপর লালাখালের বর্ণিল জল কেটে এগোতে থাকলাম আমরা। সুন্দর টলটলে নীল জল, কখনোবা স্বচ্ছ কাকচক্ষু জল। একসময় একটা টিলা মতো যায়গায় আমাকে নামতে বললেন তিনি। বললেন যে এখান থেকে ভালো একটা ভিউ পাওয়া যায়। আমিও উনার কথায় আস্থা রেখে ট্রাইপডে মোবাইল আটকে ছবি তোলার ব্যবস্থা করলাম। তারপর সেই টিলায় উঠে নজরুল ভাই নিজে থেকে আমার ও চারপাশের ছবি তুলে দিলেন। বুঝলাম, তার সাথে আমার বেশ সখ্য হয়ে গেছে কিংবা এই আন্তরিকতা তার কাজেরই অংশ।

 

টিলার ওপর সেলফিবাজি

 

টিলার ওপর বসে থেকে লালাখাল দেখছি

 

টিলার উপরের সৌন্দর্যে চোখ ভিজিয়ে আমরা জিরো পয়েন্টে গেলাম।  সেখানে পাশাপাশি দুই রঙের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর বাকি বিকেলটা হাটুপানিতে দৌড়ঝাপ করেই পার করে দিলাম। ব্যাগে একটা পেয়ারা ছিল, আমি আর নজরুল ভাই সেটা খেতে খেতে বেশ খানিকক্ষণ গল্পও করলাম। জানলাম, তার এক ছেলে এক মেয়ে এবং তারা দুজনেই মেধাবী। ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছে, এখন নাইনে পড়ে। তাদের ঘিরেই তার জীবন সংগ্রাম, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। আরো নানান কথা জীবন ও জীবিকা নিয়ে, বেচে থাকা নিয়ে। ছেলেমেয়েকে নিয়ে মানুষের হাতিঘোড়া স্বপ্নকে আমার ‘পুওর থিং’ মনে হয়, তবু মানুষ সন্তানের মুখ চেয়ে বাঁচে।

 

আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি কখনো এই সংগ্রামের সাইকেলে ঢুকে পড়তে চাই না। আমার অর্থহীন লাগে, কেননা আমার জীবনবোধ আলাদা। একইসাথে ভয়াবহ অর্থহীন এবং অর্থপূর্ণ এই জীবন – সম্ভব হলে – আমি একাই কাটাতে চাই। তাই একাকীত্বের সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করে আসছি বহুদিন থেকে। এই যে হুট করে একা পথে বেরিয়ে পড়া এটা একরকম নিজেকে পরীক্ষায় ফেলার মতো ব্যাপার।

 

নৌকার মাঝি নজরুল ভাইয়ের সাথে

 

যাহোক, স্বচ্ছ শীতল পানিতে দাপাদাপি শেষ করে ঠিক সন্ধার দিকে আবার ঘাটে ফিরলাম। তারপর স্পিকারে রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে দিয়ে নৌকার উপরে শুয়ে থাকলাম বেশ অনেকক্ষণ।

সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে নৌকার ছাদে শুয়ে আকাশ দেখতে দেখতে রবীন্দ্রসংগীত শোনার অনুভূতি অনন্য।

 

নজরুল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিতেই দেখি সেই অটোওয়ালা আলিম ভাইয়ের ফোন। আমার খোঁজ জানতে চাইলে বললাম, আমিও ফিরছি। সারিঘাট গিয়ে সিলেটের বাস ধরবো।

 

সিলেট যখন পৌঁছালাম তখন সাড়ে আটটা বেজে গেছে। হোটেলে এসে গোসল সেরে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ।  তারপর পাঁচ ভাই হোটেলে ফালতু গরুর মাংস আর চমৎকার টমেটো ভর্তা, সবজি আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে থাকলাম।

 

গতবারের তুলনায় এবার সিলেট কেমন ফাঁকা আর পরিচ্ছন্ন মনে হলো। রাস্তাগুলো এলোমেলো করে ফেলছিলাম বার বার। আমি পথ ভুলে যাই, তাই পুরোনো পথও আমার কাছে প্রায়শই নতুন হয়ে ওঠে।

 

হাঁটছি আর চারপাশের জীবনের আয়োজন দেখছি, দেখছি পৃথিবী এগিয়ে চলছে সমস্ত সংঘাত, যুদ্ধ, আর ক্ষুধাকে সাথে নিয়ে, যেখানে আমিও এসে পড়েছি, যে কিনা পেট ভরে খেতে পেলে আর সবার মতোই একাকীত্ব বোধ করে এবং সেখান থেকে বের হয়ে আসার কৌশল খোঁজে। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটার কাছাকাছি।  আমার বাইরে হেঁটে বেড়ানো কোনো একজনের খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না বুঝতে পেরে হোটেলে ফিরে এলাম। এর মধ্যে আম্মু আব্বু দুজনেই ফোন দিলেন। আমার ঘোরাঘুরি কেমন হচ্ছে, রাতে খেয়েছি কিনা এইসব সাতসতের।

 

এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে গেলে আমার এমন অনূভুতি হয়,  –  মনে হয় আমি এইমাত্র আকাশ থেকে টুপ করে পড়লাম, যেন আমি এসবের কোনোকিছুর মধ্যেই নেই। আমি স্বতন্ত্র, একাকী; তাই পৃথিবীর এই উদ্ভট অদ্ভুতুড়ে আয়োজন খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছি, জানতে চাইছি এসবের আসলে কী মানে!  আমার একটা ইন্ট্রো হচ্ছে এই ফালতুরকম মায়াবী পৃথিবীর সাথে।

 

এই যে বাতাস কেবলই ধুলো উড়িয়ে চলে গেল, এই দিন-রাত-সময় যা চিরকাল মানুষের আয়ু খেয়ে বেঁচে থাকছে, এর সবকিছুর ভেতরের ফাঁকিটা দেখে ফেলে আমার বিষন্নরকম ভালো লাগছে, আমি গাইছি, আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ….

 

জিরো পয়েন্ট, লালা খাল

 

আধশোয়া হয়ে নৌকাবাজি

 

 

নজরুল ভাইয়ের নৌকার সাথে নিজেকে বন্দী করলাম

 

 

Leave a Reply