তারিখঃ ২৭ মার্চ, ২০১৯ 

 

সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার বাসে যখন  উঠলাম ততক্ষণে সূর্য তেঁতে উঠেছে মাথার উপর, গায়ে রোদের আঁচ টের পাচ্ছি, বুঝলাম যদিও খানিকটা দেরি করে ফেলেছি উদ্দেশ্যহীনের মতো পথে ঘুরতে ঘুরতে তবুও সময় একেবারে বয়ে যায়নি।

 

কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠে হাতে বই আর কানে কাঠপেন্সিল গুঁজে রওনা হলাম সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে, সেখান থেকে যাব তাহিরপুর। তখনো জানিনা যে এই তাহিরপুর যাওয়ার পথেই আমার পরিচয় হবে জুনায়েদ এর সঙ্গে, যে একটা কলেজে পড়ে আর পাশাপাশি মোটরবাইক চালিয়ে সংসারে তার বাবাকে সহযোগিতা করে এবং তার জীবনে কোনো স্থির লক্ষ্য নেই কেননা সে জানে না ভবিষ্যতে কি হবে।

 

জানালার পাশে যে দীর্ঘদেহী ছেলেটা বসে এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে তার জন্য আমার বসতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছে, তবু নিজের সুবিধার কথা ভেবে ঘুমন্ত ছেলেটাকে জাগাতে আড়ষ্ট লাগায় আমি বাসের ওয়াকওয়ে-তে পা নামিয়ে কোনোরকমে সিটে বসে বইয়ের পাতায় চোখ রেখে এগিয়ে যাচ্ছি সুনামগঞ্জের দিকে।

 

মাঝে মাঝে বাসের জানালায় চোখ রেখে দেখছি পাশের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রবলবেগে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে, আর আমরা বাসের যাত্রীরা এগিয়ে যাচ্ছি সামনে। বোধকরি এটাই প্রকৃতির নিয়ম যে, নিজেকে সামনে নিয়ে যেতে হলে অনান্য সকলকিছুকে প্রবলবেগে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে হয়, কিংবা স্বভাবতই অন্যেরা পিছিয়ে পড়ে কেননা সামনে যাওয়া মানেই তো প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতা মানেই অন্য সবাইকে পিছিয়ে দিয়ে কিংবা অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে থেকে নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা।

 

শনির হাওড়ে দাঁড়িয়ে আছি একা

 

এইসব ভাবতে ভাবতে কখনোবা বই বন্ধ রেখে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছি। এভাবে একসময় বই, ধানক্ষেত, আর হেডফোনে গান – এসবের সম্মিলিত অনুভূতি আমাকে অদ্ভুতুড়ে এক চিত্রের সামনে দাড় করিয়ে দিল।

 

আমি আমাকে অনেক উপর থেকে দেখতে পেলাম – পাখির মতো করে – যেন মেঘের ওপর থেকে চোখ মেলে দেখা; একটা সরু রাস্তার ওপরে ‘বিরতিহীন’ এক বাসে করে একদল যাত্রী যাচ্ছে সুনামগঞ্জ নামের একটা যায়গাকে ‘প্রাথমিক গন্তব্য’ মেনে আর তাদের মধ্যে আছে মামুন নামের একজন লোক, যে কিনা এই যাত্রাপথে কখনো বই পড়ছে কানে কাঠপেন্সিল গুঁজে, যাতে করে বইয়ের কোনো কথা তার ভালো লাগলেই সে তা দাগিয়ে রাখতে পরে আবার পড়বে বলে, কখনোবা সে গান শুনছে কারণ তার কোনো প্রিয়জন নতুন কিছু গানের সন্ধান দিয়ে তাকে বলেছে শুনতে, আবার কখনোবা সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে ধানক্ষেতের দিকে, কারণ ধানক্ষেতের উপরে রোদ পড়ে তা চিকচিক করে জ্বলছে। এরই মধ্যে সে ভাবছে আকাশের উপর থেকে তাকে এবং সরু রাস্তা দিয়ে সুনামগঞ্জের দিকে ছুটে চলা এই বাসটিকে দেখতে কেমন লাগছে – সেই কথা।

 

প্রতিমুহূর্তে এই যে মহাবিশ্বের অযুতনিযুতকোটি ঘটনা একসঙ্গে যুগপৎ ঘটে চলেছে, সেখানে এই বাসে করে সুনামগঞ্জ যাওয়া, কিংবা বেঁচে থাকাকে কিছুটা অর্থবহ করে তুলতে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে যেয়ে কিছুটা সময় কাটানো আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

 

এমনই  বিক্ষিপ্ত আর অগোছালো মন নিয়ে সুনামগঞ্জ পৌছালাম প্রায় তিনটার সময়, আর হাত মুখ ধুতে যেয়ে টের পেলাম সকালে না খেয়ে থাকার দরুণ খাদ্য গ্রহণের তীব্র প্রয়োজনীয়তা। হাতে সময় কম থাকায় রাস্তার পাশের একটা দোকানে বসে গেলাম, বললাম কি আছে দাও। দোকানী – একটা দশ/বারো বছরের ছেলে – বললো বিরিয়ানি আছে, যদিও বিরিয়ানী নামক উপাদেয় বস্তু থাকার জন্য নূন্যতম যে অবকাঠামো দরকার তা দোকানটির নেই।

 

যাহোক, মাত্র ত্রিশ টাকা প্লেট বিরিয়ানী খেলাম একটা প্লাস্টিকের টুলে বসে খোলা দোকানে। আমার ক্ষুধার গুণে না রাধুনির হাতের গুণে জানিনা, খেতে খুব ভালো লাগল। আমি আরো কিছুটা নিলাম এবং খেতে খেতে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম যে আমার পাশেই কাঠের বেঞ্চে একটা ছোট মেয়ে মাথা ঝুকিয়ে মন খারাপ করে বসে আছে। তার বাবার সাথে কথায় কথায় জানতে পারলাম মেয়েটার জ্বর। ওষুধ খেয়েছে কিনা জেনে নিয়ে আমি আমার ব্যাগ থেকে একটা প্যারাসিটামল দিলাম। তারপর খাওয়া শেষ করে হাঁটতে থাকলাম একটা মোটরবাইকের সন্ধানে যে আমাকে নিয়ে যাবে তাহিরপুরের শনির হাওড়ে, যেখানে গতবার আমি জলভ্রমণ করেছিলাম আর এখন যাচ্ছি আদিগন্ত বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, সবুজের মিথস্ক্রিয়ার টানে।

 

কিছুদূর হেঁটে একটা ব্রিজের কাছে যেতেই দেখি মোটরবাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন, যদিও তাহিরপুর যাওয়ার বাইক পাওয়া যায় আরো কিছুটা সামনে থেকে। তাই আমি তাকে এড়িয়ে সামনে যেতেই ছেলেটা ডাক দিয়ে জানতে চাইলো যে আমি কোথায় যাব। গন্তব্য জানালে সে বলল সেই যেতে রাজি। আমি দরদাম করে উঠে পড়লাম, এবং  কথায় কথায় একসময় জানতে পারলাম যে ওর নাম জুনায়েদ, এখনো স্টুডেন্ট, তাহিরপুরের একটা কলেজে পড়ে আর জীবিকার তাগিদে মোটরবাইক চালায়। সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর যেতে মোটরবাইকে মোটামুটি এক ঘন্টা লাগে, রাস্তার কাজ চলছে বলে সময়টা বেশি লাগছে। আমি ওর সাথে একটা সন্ধি করে নিলাম এমন যে আমি তাহিরপুর একঘন্টা হাওড়ের ধানক্ষেত দেখে আবার ওর বাইকেই ফিরে আসবো।

 

সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর যাওয়ার পথটা সুন্দর ছবির মতো। দুপাশে চোখ জুড়ানো ধানক্ষেত, কখনোবা অসংখ্য গরু-ছাগল চরে বেড়াচ্ছে মাঠে, আবার হয়তো দেখা যাবে কিছু দূরেই ক্ষেতে ফুটবলের মতো করে থরে থরে শুয়ে আছে মিষ্টি কুমড়া, কখনো ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে সরু নদী, যেখানে বাধা আছে জীর্ণশীর্ণ দু’একটা নিঃসঙ্গ নৌকা। গতবছর এসেছিলাম এখানে বর্ষার শেষের দিকে, যখন দুপাশে ছিল পানির ভেতর ফুটে থাকা অসংখ্য লাল শাপলা, এখন সেখানেই পানির বদলে ধানক্ষেত, মাঠ, আর সরু নদীর মতো আঁকাবাঁকা রেখা।

 

পথে দেখলাম একদল ছেলেমেয়ের স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার দৃশ্য, যে দৃশ্যটি চিরকালই আমার কাছে খুব পবিত্র একটি দৃশ্য বলে মনে হয়।

 

আমার নস্টালজিয়ার ঘোরে আমি দেখতে পাই গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের ক্লাস শেষ করে বিকেলে আমি বন্ধুদের সাথে বাড়ি ফিরছি আর বিলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বন্ধুদেরই কেউ তার নামের অদ্যক্ষরের সাথে প্রিয় কারো নামের অদ্যক্ষর লিখে দিচ্ছে কাঁটা দিয়ে ফণিমনসার গায়ে, যেন প্লাস চিহ্ন দিয়ে দুটো অক্ষরকে জুড়ে দিলেই ওরা পেয়ে যাবে ওদের মনের মানুষ। এখন জানি যে, পৃথিবীর কোনো মানুষের পক্ষেই তার মনের মানুষ খুঁজে পাওয়া পারতোপক্ষে অসম্ভব, কারণ প্রতিটি মানুষই তার পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, আর শিক্ষার উপর ভিত্তি করে স্বতন্ত্র, প্রত্যেকেই আলাদা, আর এ কারণেই কেউ কারো পরিপূরক নয়। কেউ কাউকে পূর্ণতা দিতে পারে না, পূর্ণতা আসে নিজের ভেতর অত্যন্ত গহীন অনুভূতি থেকে, যে অনুভূতি এই কম্পারিজন-নির্ভর-সোসাইটি থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। মানুষ অনুভূতিশুণ্য পন্যনির্ভর এক প্রাণিতে পরিণত হয়ে শুধু গড়ে তুলেছে বিশাল বাজার ব্যবস্থাপনা নিজেদের সভ্য দাবি করে!

 

একসময় পথ শেষ হলে আমি তাহিরপুরের শনির হাওড়ে পৌছালাম। জুনায়েদকে বললাম তুমি আমার সাথেই থাকো, আমি একঘন্টা মতো ঘুরে তারপর আবার তোমার সাথেই সুনামগঞ্জ ফিরে যাব, ওখান থেকে আমাকে সিলেট যেতে হবে। জুনায়েদ বলল যে, একটু পরে হাওড়ের ভেতর আমাকে খুঁজে নেবে কিন্তু তার আগে ও একটু বাড়িতে যেতে চায়। আমি ওকে বিদায় দিয়ে নেমে পড়লাম শনির হাওড়ে, যেখানে গতবছর নৌকায় ঘুরে ইমামুল চাচার মাছ ধরা দেখেছি, খুব ভোরে শাপলা তুলেছি, সেখানেই এখন আদিগন্ত ধানক্ষেত। কোথাও কাঁচা কোথাও পাকা।

 

কাঁচা-পাকা ধানক্ষেত

 

ধানক্ষেতের আলপথ ধরে হাঁটছি আর ধানের গন্ধ নাকে এসে লাগছে, বাতাসে ধানের শিষ দুলে উঠছে আর শোনা যাচ্ছে ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার অপার্থিব শব্দ যা কান দিয়ে ঢুকে একেবারে হৃদয়ে গিয়ে থামছে।

 

দেখলাম কোথাও কোথাও মাটি ফেটে গেছে প্রচণ্ড গরম সহ্য করতে ব্যর্থ হয়ে, আবার কোথাও কোমল নরম ঘাস গজাচ্ছে প্রকৃতির নিয়মে, যেহেতু প্রকৃতি শূন্যস্থান ভালোবাসে না। আমি সবুজ, ফেটে যাওয়া মাটি, কাচা-পাকা ধানক্ষেত, শুন্যস্থান সবকিছু ভালোবেসে নিজেকে ক্যামেরাবন্দী করে নিলাম। তারপর ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে শুনতে আলপথ ধরে হেঁটে চললাম অনেকটা দূর।

 

একসময় জুনায়েদ এলো হাওড়ে আমার সাথে যোগ দিতে। ওর বাড়ির ঠিক পেছনেই এই শনির হাওড় তবুও এবছর ও এই প্রথম এলো ধানক্ষেতে,   ধানক্ষেতে বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ ও ঢেউ দেখে বিমোহিত হয়ে পড়ল। বলল, ভাইয়া আমিও মাঝে মাঝে আসব এখন থেকে। আমি বললাম, অবশ্যই আসবেন আর একা আসতে ভালো না লাগলে বন্ধুদেরও নিয়ে আসবেন।

 

ধানক্ষেতে সেলফিবাজি

 

বিকেলের সোনালি আলোয় ধানক্ষেতের রূপ অনিন্দ্যসুন্দর অনুভূতি জাগায় মনে। উপরে বিশাল আকাশ যেখানে পশ্চিম দিকে ক্রমশ ঢলে পড়ছে সূর্য আরেকটি দিনের অবসানে, কিছু মেঘের বুক চিরে বের হচ্ছে তার রশ্মি আর তারই নিচে সবুজের এই আদিগন্ত আয়োজন, বাতাসের সাথে ধানের শিষের সশব্দ শিহরণ – এইসব দৃশ্য অমূল্য।

 

আমি দৃষ্টি অসীমে প্রসারিত করে বুঝে নিলাম যে, এইসব অনুভূতি ধরে ফেলতে হলে আমাকে মাটিতে নেমে আসতে হবে, আমার আধা-কর্পোরেট পোশাক খুলে খালি পায়ে আলপথে হাঁটতে শিখে গেলেই আমি পেয়ে যাব স্বপ্নলোকের চাবি, বাড়ির কাছের আরশিনগর চেনা হবে আমার।

 

দিগন্তে রাখি চোখ

 

কোন সুদূরে, কিসের টানে

 

অলৌকিক আলোয়

 

মানুষ, নদী ও জীবন

 

আমি, শিশু, ও জুনায়েদ

 

Leave a Reply