তারিখঃ জুন ১২, ২০১৯

 

‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল
কিছুদূর যাইয়া সে রওয়ানা হইল ‘

 

টাইগারস নেস্টে উঠার সময় আমার আর মাহবুব ভাই এর অবস্থা মোটামুটি ঘোড়ায়-চড়া-মর্দের মতোই হয়েছিল। কিন্তু সে কথা যথাসময়ে হবে। তার আগে বলি কিভাবে বাই-রোডে ভূটান যাওয়ার ভূত আমার মাথায় চাপলো।

 

ভুটান সবুজ প্রকৃতি আর সভ্য মানুষের দেশ, একমাত্র দেশ যেটা কার্বন নেগেটিভ। এমনটা শুনে শুনে গতবছর ঠিক করেছিলাম ভুটান যাব। কিন্তু যাব বললেই তো আর যাওয়া হয় না, কোনো অদ্ভুত কারণে ভুটান না যেয়ে সেবার ঘুরে আসলাম ইন্ডিয়ার মানালি, চন্দ্রাতাল লেক। আমার এই হয় চিরকাল, এক করতে যেয়ে আরেক করে বসি।

 

তবে এবার ঈদের ছুটিতে ভুটান যাব একরকম ঠিকঠাক। ভুটান ঘুরে আসা বন্ধুদের কাছে খোঁজখবর নিলাম। অনলাইনে হোটেল বুকিং দিলাম, ইন্ডিয়ার ট্রানজিট ভিসার জন্য এপ্লাই করলাম, ইত্যাদি সাতসতের। কিন্তু বিপত্তি বাধলো বাসের টিকিট পাওয়া নিয়ে। কল্যাণপুর গিয়ে বাসের টিকিট না পেয়ে ফিরে এলাম, সব টিকেট চেক-ইন-প্রিয় বাঙ্গালিরা আগেই খেয়ে দিয়েছে। এদিকে আমার ভুটান ট্যুর মাঠে মারা যায়, তাই দেখে একটা পরিচিত ট্রাভেল এজেন্সিতে ফোন দিলাম। জানলাম, ওদের একটা গ্রুপ যাচ্ছে ৭ জুন, ঈদের ঠিক একদিন পর।

 

কি আর করা ! সলো ট্রাভেলের প্ল্যান বাদ দিয়ে ট্রাভেল গ্রুপে এনরোল করলাম। তারপর এলো সেই মহান ৭ই জুন ২০১৯। মানিক পরিবহনের এসি বাসে চড়ে পরদিন ভোর ৪ টায় পৌছালাম চেংড়াবান্ধা বর্ডারে। এদিকে ইমিগ্রেশান অফিস খুলতে এখনো দেরি অনেক। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মশার কামড় খেয়ে হতাশ হতে হতে আশা ফিরে পেলাম, দেখলাম জনগণের বন্ধু পুলিশ ভাইয়েরা টাকা খেয়ে নিজেরাই ইমিগ্রেশনের কাজ করে দিচ্ছে। ভোর চার টার সময় তাদের এই সেবার কথা কোনোদিন ভুলবো না। দুর্নীতিকে যে অনন্য উচ্চতায় তারা নিয়ে গেছেন, সেখানে পৌঁছানো পৃথিবীর কোনো দেশে কারো পক্ষেই সম্ভব না।

 

অবশ্য ইন্ডিয়ার পুলিশ আমাদের বর্ডারের পুলিশের মত অনন্য উচ্চতায় উঠে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন এর দায়িত্ব এখনো নিজ হাতে তুলে নিতে পারে নাই। তাই ওদের ইমিগ্রেশান অফিস খুলল সকাল ৯ টায়। আমরা সেখানে গিয়ে নানা ধরণের আমলাতান্ত্রিক ও দালালতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে মোটামুটি ৩ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে গিনেজ বুকে নাম লেখালাম। জানা গেল ঢাকা শহরের চেক-ইন প্রিয় সকল যুবসমাজ সিকিম যাওয়ার জন্য এই বর্ডারে হাজির। সবাই বলাবলি করল যে তারা এহেন ভ্রমণপ্রিয় যুবসমাজ ইহ জনমে দেখে নাই।

 

ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশান শেষ করে প্রায় বেলা ২টার সময় আমরা একটা মিনিবাসে করে রওনা দিলাম জয়গা এর উদ্দেশে। জয়গা’র ওপারেই ভুটানের ফুন্টশেলিং শহর।

 

রাস্তার দু’ধারে সমতলভূমিতে চা বাগান আর উপরে সাদা মেঘের আকাশ দেখতে দেখতে প্রায় বিকেল ৫ টার সময় পৌছালাম জয়গা বর্ডারে। সেখান থেকে পাসপোর্টে সিল নিয়ে চলে গেলাম ভুটানের ফুন্টশেলিং এর ইমিগ্রেশান অফিসে। তারপর ভুটানের ইমিগ্রেশন লাইনে প্রায় আড়াই ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে বুঝলাম কেন ভুটানিজরা শান্তিপ্রিয় জাতি। তারা কোনো কাজই তাড়াহুড়া করে করতে রাজি নয়।

 

সেদিনের মতো সকল সিল-ছাপ্পড় মারা শেষ করে রাতের বেলা ফুন্টশেলিং শহর ঘুরে দেখলাম। জয়গা আর ফুন্টশেলিং একদম পাশাপাশি। জয়গার তুলনায় ফুন্টশেলিং স্বর্গ। একেবারে গোছানো, পরিচ্ছন্ন শহর। কোনো হর্ণের শব্দ নেই। রাস্তায় কোনো ময়লা নেই। জয়গার একদম বিপরীত চিত্র। আমরা একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে চিকেন চাউমিন, চিকেন ফ্রাইড রাইস আর প্রন ফ্রাইড রাইস নিলাম। খেয়ে দেয়ে বুঝলাম খাবার যথেষ্ট ভালো, অযথাই বন্ধুবান্ধব ভুটানের খাবারের ব্যাপারে ভয় দেখিয়েছে।

 

হোটেল শীতলের শীতল পরিবেশে রাতটা কাটিয়ে পরদিন রওনা দিলাম ভুটানের রাজধানী থিম্পুর উদ্দেশ্যে। ফুন্টশেলিং থেকে থিম্পু মোটামুটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘন্টার পাহাড়ি রাস্তা। খুব সুন্দর আবহাওয়া ছিল সেদিন। কখনো মেঘলা আকাশ, কখনো রোদ্দুর। প্রায়ই মেঘ ভেসে যাচ্ছিল গাড়ির সামনে দিয়ে। দূরে পাহাড়ের গায়ে গায়ে অনুচ্চ বাড়ি। সবমিলিয়ে ফুন্টশেলিং থেকে থিম্পু যাওয়ার পথটা সুন্দর, মন ভালো করা।

থিম্পু যাওয়ার পথে এ হোটেলেই আমরা দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম

থিম্পু পৌঁছে আমরা প্রথমে গেলাম বুদ্ধ পয়েন্টে। পাহাড়ের মাথায় বিশাল এক বুদ্ধ-মূর্তি। যেন পাহাড়ের উপর থেকে তিনি পুরো থিম্পু শহরের উপর নজর রাখছেন। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় আমাদের বুদ্ধ-দর্শন হলো। বুদ্ধ পয়েন্টের সামনে বিস্তুর্ত লনে আমরা অনেকটা সময় কাটালাম। চারিদিকে পাহাড়, নিচে থিম্পু শহর, উপরে আকাশভর্তি সাদা সাদা মেঘ, মৃদুমন্দ বাতাস – সবকিছু মিলিয়ে অনিন্দ্যসুন্দর অনুভূতি।

 

ভুটানের সুন্দর প্রকৃতি দেখতে দেখতে আমার প্রকৃতির ডাক এলো। মাইনাস করতে বুদ্ধ পয়েন্টের নিচের ওয়াশরুম সেকশনে এসে দেখি একটা ওয়াশরুম ছাড়া বাকি সব বন্ধ। ভুটানিজ এক মেয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তার সাথে কথা হলো। সে একটা হাসপাতালে কাজ করে, বিকেলে বুদ্ধ পয়েন্ট ঘুরতে এসেছে। কতো সহজভাবে কথা বলল, মুখে সৌজন্যতার মৃদু হাসি বজায় রেখে। আমি ভাবলাম এখানে যদি আমার দেশের কোনো মেয়ে হতো দেমাগের ঠেলায় মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখতো যাতে কথা না বলতে হয়। ভেবে ভালো লাগল যে ভুটানের মেয়েরা আমাদের দেশের মেয়েদের মতো নিজেকে রানী ভিক্টোরিয়া এবং একই সাথে   জনবিশেক রোমিওর প্রেমিকা ভাবে  না।

 

দেখলাম পাহাড়ি রাস্তায় অনেকে সান্ধ্যকালীন জগিং করছে। ভুটানে এই জিনিসটা খুব ভালো, কারো শরীরে মেদ নেই। ঝরঝরে শরীর, কর্মোদ্যম। কোনো মোটা লোক চোখে পড়েনি ভুটানে।

 

বুদ্ধা পয়েন্ট থেকে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম। আসার পথে আমাদের গাইডের বোন তার দুই বান্ধবীকে নিয়ে আমাদের গাড়িতে লিফট নিলো। গাইডের নাম চিগ মি। আমি একদম পেছনের রোতে একা বসে আছি। সে আমাকে এসে বলল, ইউ জেমস বন্ড, গার্লস উইল সিট উইথ ইউ, ওকে? আমি বললাম, ওকে, নেভার এ প্রবলেম।  ওদের সাথে টুকটাক কথা হলো। তারা খুব হাসিমুখ। কোথা থেকে এসেছি জানতে চাইল। নেমে যাওয়ার সময় সৌজন্যমূলক হাত নেড়ে বিদায় নিল। এ ব্যাপারটা খুব ভালো লেগেছে। ভুটানে মানুষের ব্যবহার, সৌজন্যতা একদম ফ্রেমে বাধাই করে রাখার মতো। বেশিরভাগ মানুষই আন্তরিক এবং হাসিমুখ।

 

হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বসতেই গাফফার ভাই বললেন, মামুন ভাই চলেন বাইরে যাই, রাতের থিম্পু শহর ঘুরে আসি। আমি বললাম, একটু রেস্ট নেবেন না। উনি বললেন, আরে! সেকেন্ডে সেকেন্ডে ডলার খরচ হচ্ছে হোটেলে বসে থাকার কোনো মানে নাই, চলেন বাইরে। ভুটানে গাফফার ভাই আর আমি এক রুমে ছিলাম। অমায়িক লোক। খুব আন্তরিক আর রসিক।

 

রাতের থিম্পু শহর দেখতে আমরা পথে নামলাম। ক্লক টাওয়ারের এখানে বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। দু একটা দোকানে ঢু মারলাম। আলো আধারিতে ফটোসেশন হলো। তারপর এ পথ থেকে সে পথ ঘুরে ঘুরে হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে সব ভালো হোটেলে নিজস্ব রেস্টুরেন্ট আছে এবং মোটামুটি সব খাবার সেখানে পাওয়া যায়। আমরা হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি খেলাম। তারপর আবার হাঁটাহাঁটি। রাত সাড়ে নটা দশটার পর থিম্পু শহরে অদ্ভুত নীরবতা নামে। সব দোকান পাট বন্ধ। রাস্তাঘাট জনমানবশূন্য। আমরা হেঁটে হেঁটে দেখলাম কপাট লাগানো দোকান, বন্ধ সিনেমা হল, দু একটা পুলিশ, পরিচ্ছন্ন ফুটপাত, এখানে সেখানে হেঁটে বেড়ানো কুকুর, আর গায়ে মেখে নিলাম বাতাসের প্রশান্তি। পরদিন ভোরে উঠেও ঘুরলাম থিম্পুর রাস্তায়। একই রাস্তা, একই স্নিগ্ধতা, একই শান্তি। থিম্পু আমার প্রত্যাশার চাইতে সুন্দরভাবে  ধরা দিয়েছে। কয়েকটা দিন এখানে কাটাতে পারলে, শহরের পালসটা ধরতে পারলে ভালো হত। কিন্তু কি আর করা, গ্রুপ ট্যুরে এসে তো আর বিচ্ছিন্নতা চলে না।

 

পরদিন সকালে আমরা রওনা দিলাম পারো শহরের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে দেখলাম থিম্পুর আর্চারি গ্রাউন্ড। অনেক দেশিবিদেশি পর্যটক গ্যালারিতে বসে দেখছে তীর নিক্ষেপ। ট্রাডিশনাল ডান্স হচ্ছে প্রতিযোগির মনযোগ নস্ট করার জন্য। সে এক মহাযজ্ঞ।

 

থিম্পু থেকে পারোতে যেতে ঘন্টা দেড়েক মতো সময় লাগল। মাঝে আমরা তিন পাহাড়ী নদীর মোহনায় থামলাম। পারো রিভারের ঠান্ডা পানিতে পা ভেজালাম। পারো ছোট্ট একটা শহর। ছবির মত সুন্দর। পারোতেই রয়েছে ভুটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। এছাড়া ভুটানে আরো তিনটি লোকাল বিমানবন্দর আছে।

 

পারোতে পৌঁছে সিটি হোটেলে লাঞ্চ সেরে আমরা সোজা চলে যাই টাইগারস নেস্টে (Paro Taktsang)। টাইগারস নেস্ট পাহাড়ের একেবারে মাথায় অবস্থিত একটি টেম্পল। দীর্ঘ ভ্রমনজনিত অবসাদে এত উপরে হেঁটে হেঁটে ওঠার স্ট্যামিনা আর অবশিষ্ট নাই। আমি মাহবুব ভাইকে বললাম, কি ব্যাপার উঠবেন উপরে? উনি বললেন, আরে এতদূর এসে একটু এডভেঞ্চার না করলে হবে?

 

যে কথা সেই কাজ। এডভেঞ্চার করতে আমরা দুটো ঘোড়া ভাড়া করলাম। আমার ভাঙা হিন্দি ব্যবহার করে বিস্তর দামাদামি করে অবশেষে ৪০০ রুপি পার ঘোড়াতে রফা হলো। দুজনে দুটো ঘোড়া নিয়ে পাহাড়যাত্রা শুরু হলো। ঘোড়া হাঁটতে হাঁটতে অতি ধীরে ধীরে পাহাড়ী পথে যাচ্ছে। আমি এতদিনে বুঝলাম ‘ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ কথার অর্থ। মাহবুব ভাই জীবনে এই প্রথম ঘোড়ায় উঠেছেন, তাও আবার পাহাড়ে। প্রথম বিশমিনিট তার কোনো সাড়াশব্দ নাই। শক্ত হয়ে ঘোড়ায় বসে আছে। পরে বুঝলাম তিনি প্রচণ্ড ভয়ে আছেন যদি ঘোড়া তাকে নিয়ে পাহাড় থেকে পড়ে যায়। ঘোড়া কন্ট্রোল করতে অবশ্য ঘোড়ার মালিক আমাদের পাশে হেঁটে চলছিল। মালিক মহিলা হওয়াতে মাহবুব ভাইয়ের খুব আত্মসম্মানে লাগতেছিল। আমরা তাগড়া যুবক হয়ে ঘোড়ায় যাচ্ছি আর মহিলা হেঁটে হেঁটে উঠতেছে। আমি মাহবুব ভাইকে বললাম, ভাই এত চাপ নিয়েন না, এইটা তার ব্যবসা। এমবেরাসড ফিলিং এর কিছু নাই। তাছাড়া আমাদের স্ট্যামিনার যা অবস্থা তাতে করে হেঁটে উঠতে গেলে কয়েক বছর লেগে যাবে।

 

যাহোক, ঘোড়া একটা নির্দিষ্ট স্থানে থামল, সেখান থেকে আর সে যাবে না। বাকি পথ আমাদের হেঁটে যেতে হবে। আমরা ভাবলাম, তথাস্তু। এবার হাঁটা যাক। কিন্তু হাঁটা শুরু করতেই বুঝতে পারলাম কতো ধানে কত চাল। মিনিট ১৫ হাঁটার পর হাঁসফাঁস লাগা শুরু হলো। বুঝলাম যে ঘটনা বেগতিক, আর হবে না। অতিরিক্ত মরদানি দেখাতে গিয়ে যদি আরো সামনে যাই তাহলে মাথা ঘুরে পড়ে থাকা লাগবে, তারচেয়ে ভালো একটু রেস্ট করে মানে মানে নেমে পড়ি। মাহবুব ভাইকে বলতেই সে রাজি হয়ে গেল। এতক্ষণে তার এডভেঞ্চার বের হয়ে গেছে। যাহোক আমরা কিছু ছবিটবি তুলে একটা ভিন্ন পথে নামা শুরু করলাম। কখনো গাছের ছায়ায় বসলাম, ছবি তুললাম। পাহাড়ের মাথায় আলোছায়ার খেলা দেখলাম। নামতে নামতে আমার মধ্যে বান্দরপ্রতিভা বিকশিত হলো। আমি একটা গাছে লাফ দিয়ে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে মাহবুব ভাইকে বললাম, ভাই ছবি তোলেন। কিন্তু মাহবুব ভাই একটাও আন্তর্জাতিক মানের ছবি তুলতে পারলেন না, আফসোস !

 টাইগারস নেস্ট থেকে ফেরার পথে 

টাইগার নেস্ট থেকে নেমে আমরা গেলাম পারো জং দেখতে। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে পারো রিভার তার উপরে পাহাড়ের গা ঘেষে পারো জং। নদীর মনমাতানো মিউজিক আর রোদ-ঝলমল অপূর্ব বিকেল মন্ত্রমুগ্ধ  করে রাখলো আমাদেরকে। আমাদের মধ্যে অতি-উতসাহী কয়েকজন আবার ভুটানিজ ড্রেস পরে ছবি তুলল। পাশের একটা দোকানে ভুটানিজ ড্রেস ভাড়া পাওয়া যায়। পার পারসন ২০০ রুপি। আমাদেরকে পাগলে কামড়ায়নি বলে আমরা এসব ফালতু কর্ম করে অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকলাম।

 

এরপর বিকেলে আমি আর আসাদ ভাই হাঁটতে হাঁটতে পারো শহরের পেছনের একটা গ্রামে গেলাম। আসাদ ভাইয়ের সাথে ততক্ষণে আমার দহরম মহরম সম্পর্ক। হাসতে হাসতে দুজনের পেট ব্যথা হয়ে যাচ্ছে একেক কথায়। আমরা একটা ফার্মহাউজে ঢুকলাম। সেখানে ‘সভ্যতা ও কৃষি’ নামে আমরা একটা অতিউদ্ভট ভিডিও বানালাম। সেসব আসলে বলে বোঝানোর মত না। এক্সট্রিম লেভেল এন্টারটেইনমেন্ট।

 

এ গ্রামে হাঁটতে হাঁটতেই দেখতে পেলাম একটা লনে দুটো ছোট ছেলে সাইকেল চালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর তাদের বোন (খুব সম্ভবত) প্রাইভেট কার চালানোর প্রাকটিস করছে। আমরা সেখানে ঢুকলাম। আমার হাতে ট্রাইপডে আশপাশের ছবি তোলা শুরু করতেই পিচ্চিটা এসে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কথায় কথায় জানলাম তার বাবা আমেরিকা থাকে। পিচ্চির আরেকটা ভাইও আসলো। তারপর আমি ছোটবেলার সমাজ বইয়ে পড়ে সেই ভুটানের শিশুদের সাথে নিজেকে ক্যামেরাবন্দি করে নিলাম। এমন উচ্ছল বাচ্চা আমি আমার দেশেও দেখি নাই।শিশুদের আমি যে খুব ভালোবাসি এমন নয়, তবে ভুটানের শিশুদের আমি ভালোবেসে ফেললাম। আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের ফার্মের মুরগি বানিয়ে ফেলে কিন্তু এখানে তেমন না। প্রায় সব শিশুই স্বতঃস্ফুর্ত। কোনো ইনসিকিউরিটি ফিলিংস নাই, দ্বিধা নাই। হেসে হেসে কথা বলছে। ছবি তুলে দিতে বলছে।

ভুটানের শিশু ও বাংলাদেশের বুড়ো

 

রাতে পারোর দোকানগুলোতে আমরা ঢু মারলাম। বলা যায় সব দোকানেই মেয়েরা বেচাকেনা করছে। আমি আর আসাদ ভাই একটা দোকানে ঢুকলাম কিছু সুভেনির কিনতে। দোকানি একটা মেয়ে। ওদের দেশের ট্রাডিশনাল পোশাক পরা। এত অমায়িক ব্যবহার আমি কোথাও দেখি নাই। কেনাকাটা শেষেও মেয়েটাকে দেখার জন্য দোকানের সামনে ঘুর ঘুর করলাম কিছুক্ষণ। বলা বাহুল্য ভুটানের মেয়েরা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাদের সাবলীলতা, হাসিমুখ, সৌন্দর্য তুলনাহীন।

 

আমরা পারোতেও অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে হাঁটাহাঁটি করেছি। এদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আমরা তখন রাতের আলোকিত পারো জং এর সামনে। পুরো পারো সিটিতে তখন আমরা চারজন ছাড়া আর কেউ বাইরে নাই। দু’একজন পুলিশ ছিল অবশ্য। একটা মাত্র দোকান খোলা ছিল, নাম ২৪/৭। প্রায় বারোটার দিকে হোটেলে ফিরলাম। গিয়ে দেখি হোটেলের মেইন গেট লক। এখন উপায়?, হোটেল থেকে বলেছিল যে সারারাত গেইট খোলা থাকে। আমাদের কারো কাছে আবার ভুটানিজ সিমও নাই। বাধ্য হয়ে বাইরে দেয়া ইমার্জেন্সি নাম্বারটা টুকে নিয়ে চলে গেলাম ২৪/৭ নামের দোকানটাতে। দোকানি আপুকে বলতেই তিনি নাম্বারে ফোন দিলেন। কয়েকবার পর কানেক্ট করা গেল। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার হোটেলের সামনে এলাম। কিন্তু কোথায় কি ! গেইট আগের মতোই তালা দেয়া। আবার সেই দোকানে যেয়ে দোকানি আপাকে ডিস্টার্ব করবো কি করবো না এমনটা ভাবছি। ঠিক তখনই তিনজন পুলিশ ভাইকে পেলাম। তাদেরকে সমস্যা খুলে বলতেই তারা ফোন দিল আমাদের সেই নাম্বারে। বলাবাহুল্য তার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় হোটেলের একজন লোক এসে গেট খুলে দিল। আমরা ভুটানিজ পুলিশকে ধন্যবাদ দিলাম।

 

ভুটান চমৎকার একটা দেশ। মিনিমাম সাত থেকে দশ দিন সময় নিয়ে যাওয়া উচিত এখানে। প্রত্যেকটা সিটিতে এক দুই দিন করে থাকতে হবে সিটির পালস ধরতে হবে। তাহলেই না শান্তি। আমরা ট্যুরে বেশিরভাগ সময় দৌড়ের উপরে থেকেছি, কিন্তু এরপরো ভুটান এক অনন্যতা নিয়ে ধরা দিয়েছে আমাদের চোখে। ভুটানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মানুষের ব্যবহার, অনন্য সংস্কৃতি আমাদের মনে থেকে যাবে বহুদিন।

 

কে জানে, হয়তো অচিরেই আবার ঘুরে আসবো ভুটান থেকে কিছু সুখী মানুষের মুখ দেখে নিজেদের খানিকটা সুখী করতে।

 

 

পারো, ভূটান

 

রিসেপশন ডেস্ক, হোটেল সিজন

 

টাইগারস নেস্ট যাওয়ার পথে এ পর্যন্ত ঘোড়ার পিঠে করে আসা যায়, এর পর হাঁটা ছাড়া গতি নেই

 

পারো জং

 

আমি ও আসাদ ভাই

 

পারো শহরের আকাশ

 

হোটেল সিটি, এখানে খুব তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছিলাম

 

পরিচ্ছন্ন থিম্পু

 

থিম্পু ভিউ পয়েন্ট

 

আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড, নাম ভুলে গেছি

 

আমি ও মাহাবুব ভাই (ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল)

 

ভুটানের শিশু

 

আর্চারি গ্রাউন্ড, থিম্পু

 

ফুয়েন্টশিলিং থেকে থিম্পুর পাহাড়ি পথে

 

Leave a Reply