তারিখ : জুন ২১, ২০১৯

 

ভুটান ট্যুরে আসাদ ভাইয়ের সাথে আমার দুর্দান্ত খাতির হয়ে গেল। নানা বিষয় নিয়ে হাসতে হাসতে দুজনের প্রায় যায় যায় অবস্থা।

 

উনার আবার ভুটান ট্যুরের পর দুই দিনের দার্জিলিং ট্যুর আছে। ঠিক করলাম উনাদের  সাথে দার্জিলিং যাব। ট্যুর অপারেটর স্বপ্নিল ভাইকে বলতেই রাজি হয়ে গেলেন। ব্যাস, ভুটান ট্যুর শেষ করে আমি চললাম দার্জিলিং এর পাহাড়ী রাস্তায়। আমি আর আসাদ ভাই, আমাদের সাথে আরো চারজন।

 

জয়গা থেকে দার্জিলিং এ যেতে মোটামুটি ৫-৬ ঘন্টার মত সময় লাগে। যাওয়ার পথটা মেঘে মোড়ানো। আঁকাবাঁকা রাস্তা। বাঁকে বাঁকে মেঘেরা অপেক্ষা করছে গাড়ির কাঁচ ভিজিয়ে দেয়ার জন্য। মনে হয় যেন সামনের কুয়াশার মতো মেঘ পেরোলেই পাওয়া যাবে স্বপ্নলোকের সন্ধান।

 

দার্জিলিং পৌছুতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে গেল। উঠলাম হোটেল সায়ান এন্ড স্পা নামের একটা হোটেলে। একদম পাহাড়ের উপরে হোটেল , প্রথমে খুঁজে পেতে খুব বেগ পেতে হয়েছে। তবে হোটেল দেখেই মন ভালো হয়ে গেল। দুর্দান্ত হোটেল, সামনে কৃত্রিম ঘাসের লন। যেখানে দাঁড়িয়ে মেঘ-পাহাড়ে ঘেরা দার্জিলিং পুরোটা দেখে নেয়া যায়। আমি আর আসাদ ভাই  থাকলাম ১০৩ নাম্বার রুমে, সেকেন্ড ফ্লোর।

 

হোটেল সায়ান রিসোর্ট এন্ড স্পা এর লবি, দার্জিলিং

 

পারো থেকে জয়গা হয়ে দার্জিলিং – বিশাল এক জার্নি করে আমার অবস্থা মোটামুটি বেগতিক। আমি শাওয়ার নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকলাম। এদিকে আসাদ ভাই বেরিয়ে গেল রাতের দার্জিলিং এক্সপ্লোর করতে। তারপর রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ফিরে এলো একগাদা শপিং আর মুখভর্তি হাসি নিয়ে। সে নাকি এত বেশি আনন্দ নিয়ে বারগেইনিং কখনো করে নাই !

 

দার্জিলিং এর আবহাওয়া খুব সুন্দর। রাতে ১৪ ডিগ্রি মতো। খুব বেশি শীতও না, আবার গরমও না। বেশ আরামের ঘুম দিলাম।

 

পরদিন সকালে আমরা বের হলাম দার্জিলিং ঘুরতে। প্রথমে রক গার্ডেন, সেখান থেকে দার্জিলিং চিড়িয়াখানা, তারপর চা বাগান, ফেরার পথে তেনজিং রক।

রক গার্ডেন যাওয়ার পথে

 

একটা ঝর্ণাকে ঘিরে যে দারুণ একটা পর্যটন স্পট তৈরি করে ফেলা যায়, রক গার্ডেন এর সুন্দর এক উদাহরণ।  আমি আসাদ ভাইয়ের ক্যামেরা ট্রাইপডে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানের অনেক ছবি তুললাম। আসাদ ভাই এমনিতে অনেক হাসিখুশি মানুষ হলেও, ক্যামেরার সামনে নাকি সে গোমড়া মুখে থাকে।

 

যাহোক,  আমার মতো বদ লোকের সঙ্গে দুইদিন মিশে সে ক্যামেরার সামনে দাঁত কেলানোর  একশো একটি কৌশল এরই মধ্যে আয়ত্ত করে ফেলেছে। কিছু ছবিতে তার হাসি সেটাই প্রমাণ করে।

 

রক  গার্ডেন থেকে গেলাম চিড়িয়াখানা। রাস্তা ভয়াবহ জ্যাম। ঢাকার জ্যাম দার্জিলিং এ কিভাবে আসলো বুঝলাম না। দার্জিলিং চিড়িয়াখানাটা খুব ছোট্ট, তবে গোছানো। আমরা ইতিউতি ঘুরে ঘুরে অল্প চিড়িয়া আর অনেক সুন্দরীদের দেখলাম। এখানে একটা মিউজিয়াম আছে হিমালয়ান মাউন্টেইন ইন্সটিটিউট এর। বেশ সমৃদ্ধ। মিউজিয়ামে ঘুরে হিমালয় অভিযানে নিহত অভিযাত্রিকদের ফেলে যাওয়া দ্রব্যসামগ্রী দেখে মন শীতল হয়ে উঠল।

 

দার্জিলিং জু ঘুরে, সেখান থেকে আমরা গেলাম চা বাগানে। বাগানের সামনে অনেকগুলো দোকানে বিক্রি হচ্ছে সেই বাগানেরই চা। সব দোকানে নাম্বার লেখা আছে। আমরা আগে চা খেয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম। আসাদ ভাই একাই তিন কাপ চা সাবাড় করল। তারপর দুজনে মিলে চা-পাতা কিনলাম।

 

আসাদ ভাইয়ের সাথে মিশে এই ট্যুরে আমার একটা বাজে অভ্যাস হয়েছে। আমি সাধারণত কিছু কিনি না। কোথাও গেলে শুধুমাত্র  ঘুরেই  চলে আসি। কিন্তু এবার উনার পাল্লায় পড়ে এটা ওটা কিনতে কিনতে দেখি বেশ অনেক শপিং করে ফেলেছি। নতুন একটা বদভ্যাস (!) হলো। তবে প্রিয়জনের জন্য কিছু কেনাতেও যে আনন্দ আছে সেটা বেশ টের পেলাম এবার। চা-বাগানের পাশেই এক ব্যক্তি টেলিস্কোপ দিয়ে সিকিম দেখাচ্ছে। আমরা তিরিশ রুপি দিয়ে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে সিকিমসহ আরো কিছু কিছু জিনিস দেখলাম।

 

কেবল-কারে চড়া হলো না, টিকেট কাউন্টার বন্ধ থাকার কারণে। দেখলাম দার্জিলিং স্টেশনে টয় ট্রেন। যদিও আহামরি তেমন কিছু নয়। দার্জিলিং শহরটা দিন দিন ঘিঞ্জি হয়ে উঠছে। বাড়ির গায়ে বাড়ি, তার গায়ে হোটেল, এটা সেটা সাতসতের। শহরের ভেতরটা অতটা পরিচ্ছন্ন নয় ভুটানের শহরের মতো।

টয়-ট্রেন ও স্টেশন

 

ঘোরাঘুরি শেষ করে হোটেলে ফিরে আবার বের হলাম। আসাদ ভাই ফাস্টট্র্যাক থেকে একটা ঘড়ি কিনল। তারপর আমরা অন্য একটা দোকানে এক অদ্ভুত সেলসম্যানের কথার যাদুতে মুগ্ধ হয়ে আরো চারটা ঘড়ি কিনে ফেললাম।

 

দার্জিলিং এ সাড়ে নটার পর তেমন দোকানপাট খোলা থাকে না। এদিকে পেট চো চো করছে। আমরা স্ট্রিট ফুড খাব ঠিক করলাম। মমো, চিকেন চাউমিন, আর চিকেন ফ্রাই দিয়ে রাতের খাবারের ইতি টানলাম।

 

নানান গল্পে হাসতে হাসতে সেদিন আর ঘুম হলো না রাতে।

 

পরদিন ভোর সাড়ে চারটার সময় ড্রাইভার হাজির। আমরা যাব টাইগার হিল, সানরাইজ দেখতে। ঘুমচোখে গেলাম সেখানে। আমরা পৌছানোর প্রায় দুই তিন মিনিট পর সূর্যোদয় হলো। এই সূর্যদয় দেখার জন্য কেন এত লোকের ভিড় বুঝলাম না। আরে, এর চেয়ে ভালো সূর্যদয় তো আমার বাসার ছাদ থেকেই দেখা যায় !

 

যাহোক, সূর্যদয় দেখে আমরা রওনা দিলাম মিরিকের উদ্দেশ্যে।

 

দার্জিলিং থেকে মিরিক পর্যন্ত রাস্তা স্বপ্ন দিয়ে তৈরি। চোখ জুড়ানো সুন্দর প্রতিটি বাঁক। লম্বা লম্বা গাছগুলো যেন পাহাড়াদারের মতো দাঁড়িয়ে রাস্তার দুপাশে। মন ভালো করা বাতাস আছড়ে পড়ছে চোখে মুখে গাড়ির জানালা দিয়ে। চোখে মুখে বাড়ি খাচ্ছে স্নিগ্ধতা। কানে বাজছে মৃদু স্বরে প্রিয় কোনো গান। আহা, এই পথটার কথা মনে থাকবে বহুদিন।

 

মিরিক লেকের পাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে গাছের সারি। আমি আর আসাদ ভাই ফটোসেশন করলাম কিছুক্ষণ। তারপর লেকের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষজন নিয়ে কিছুক্ষণ গবেষণা করে আবার গাড়িতে উঠলাম। এবার ঘরে ফেরার পালা।

 

সবুজের সাথে সেলফিবাজি

 

রক গার্ডেন, দার্জিলিং

 

আসাদ ভাই ও আমি

 

হোটেলের লবি থেকে চোখ জুড়ানো দার্জিলিং

 

মিরিকে এসে আমার ভুবন ভোলানো হাসি

 

মিরিক যাওয়ার পথে এই অনিন্দ্যসুন্দর জায়গায় কিছুক্ষণ থেমেছিলাম

 

Leave a Reply