তারিখ : জুলাই ৬, ২০১৯

 

আজ বিকেলে আকাশ অন্ধকার করে রাত নেমে এলো, তারপর ঝুমঝুম বৃষ্টি। আমরা ব্রহ্মপুত্র নদীতে নৌকার উপর। মাঝি নৌকাটা কোনো রকমে হাঁটু-পানিতে বেঁধে রেখে দৌড়ে একটা দোকানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দুই ভাইবোন নদীতে নৌকায় বসে আছি বৃষ্টির ভেতর।

 

সোনিয়াকে বললাম, তুই ছাতা মুড়ি দিয়ে বসে থাক, আমি বৃষ্টিতে ভিজব।  সে লক্ষী মেয়ের মতো ছাতা মুড়ি দিয়ে বসে থাকল আর আমি নৌকায় দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকলাম। এরই মধ্যে হাওয়ার তোড়ে ছাতা উলটে দুটো শিক ভেঙে গেল।

 

আকাশভর্তি কালো মেঘ, ঝড়ো হাওয়া। বড় বড় বৃষ্টির ফোটা বাতাসে আছড়ে পড়ছে, নদীর উপর তার টুপটাপ শব্দ। নদীতে আর কোনো নৌকা নেই। দৃষ্টিসীমা জনমানবহীন। যেহেতু পৃথিবীতে বোকা মানুষের সংখ্যা কম, তাই সবাই গা বাঁচিয়ে নিরাপদ আশ্রয় বেছে নেয় এসময়। তবু এরই মধ্যে আমি  নৌকায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজে চলেছি আর আমার মাথার ভেতর বৃষ্টি সম্পর্কিত স্মৃতিগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।

 

ছোটবোন ও আমি

 

অনেকদিন আগে, আমার স্কুল-জীবনে, যশোরের বুকভরা বাওড়ের রাস্তায় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির ভেতর পড়েছিলাম। সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিলাম,ঝড়-বৃষ্টির বিপরীতে। দুপাশে বিস্তীর্ণ বিল, মাঝে সরু রাস্তা। বাতাসের কারণে এগোতে পারছি না। বৃষ্টির ছাট আমার শরীর যেন ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল সেদিন।

 

মনে পড়ল, কলেজ জীবনে আমরা তিন বন্ধু (আমি, রানা, তুহিন) খুব বৃষ্টিতে ভিজতাম। বৃষ্টি, আমাদের খুনসুটি, সবুজ মাঠ, ফুটবল, হাসাহাসি।

 

বেশ কিছুদিন আগে বালুনদীতে গিয়েছিলাম, যদিও সেদিন আকাশে বৃষ্টি ছিলো না। তবু মনের মধ্যে আনন্দের বৃষ্টি হয়েছিল।

 

এসবের সাথে আরো মনে পড়লো ‘দ্যা ক্লাসিক’ ছবির বৃষ্টিভেজা একটা দৃশ্য, যেখানে প্রধান দুই চরিত্র বৃষ্টিতে একটা তরমুজ ক্ষেতের পাশে মাচায় বসে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে তরমুজ খায়। আহা, অনবদ্য। এমনি নানান ধরনের বৃষ্টি-অবৃষ্টি স্মৃতি মাথার ভেতরে নিয়ে নৌকায় দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে নদীতে বৃষ্টিপাত দেখছি। হঠাৎ আকাশ আলো করে বজ্রপাত হলো দূরে কোথাও।

 

ও নদী রে …

 

সোনিয়াকে বললাম, বজ্রপাত আছে এমন একটা  গল্প পড়েছি আজ সকালে। শাহাদুজ্জামানের লেখা। গল্পের নাম, পৃথিবীতে হয়তো বৃহস্পতিবার।

 

যদিও এখন শুক্রবার বিকেল। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে ঝুপ করে। বৃষ্টিও হয়তো থেমে যাবে আরো কিছুক্ষণ কেঁদেকেটে। কেননা পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী নয়।ছোটবোন আমারঠান্ডা লেগে যাবে এই ভয়ে উদ্বিগ্ন। অথচ আমি খুব আনন্দ নিয়ে ভিজছি। ঠান্ডা বিষয়টা মাথাতেই নেই বরং আমার মনে পড়ছে সকালে পড়া গল্পটার কথা।

 

গল্পের নায়ক মাসুদ তার কলিগের কাছ থেকে প্রতারণার শিকার হয়ে নিরালম্ব মন নিয়ে বাড়ি ফিরছে। ফেরার পথে আকাশ মেঘ করে আসে, বৃষ্টি হয়। আর সেই সাথে শুরু হয় একের পর এক বজ্রপাত। বোঝা যায়, মাসুদের মন আর বাইরের প্রকৃতির অবস্থা মোটামুটি একই রকম।

 

এমন সময় হঠাৎ করে তার মোবাইল বেজে ওঠে। সে দ্যাখে রুমার ফোন। রুমার সাথে তার সম্পর্কটা অলিখিত, কোনো নাম নেই এর। নাকি আছে?

 

বজ্রপাতের ভেতর মাসুদ ফুটপাতে হাঁটছে শুনে রুমা বলে, দেখতেছ না কী রকম বজ্রপাত হচ্ছে? ফুটপাতে না হেঁটে একটা কোনো শেডের নিচে যেয়ে দাঁড়াও।

 

রুমার কণ্ঠস্বর শুনে মাসুদের মনে হলো, উজ্জ্বল হলুদ পা নিয়ে একটা শালিক পাখি আলতো করে তার ভারী হয়ে ওঠা বুকের ওপর বসল।

 

একসময় ফোন রেখে মাসুদ ভাবতে থাকে রুমার কথা।

 

শুক্রবার আসন্ন সন্ধ্যার প্রাক্কালে নৌকায় দুলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমিও কোনো এক রুমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করছি। ভাবছি, এক্ষুনি আমার ভারী হয়ে ওঠা বুকের ওপর একটা শালিক পাখি তার উজ্জ্বল হলুদ পা নিয়ে আলতো করে বসবে।  কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল যে, আসল সত্যটা পূর্ণেন্দু পত্রী তার একটি কবিতায় লিখে গেছেন – ”যে টেলিফোন আসার কথা সচরাচর আসে না ”

 

আমি তাই বৃষ্টি, বজ্রপাত, গল্প, স্মৃতি ইত্যাদি নানান কিছু মাথার ভেতরে সেঁধিয়ে চোখ বন্ধ করলাম।

 

দেখলাম, নদীতে নৌকায় দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দুলে উঠতে মন্দ লাগে না।

 

ভিন্ন ফ্রেমে বন্দী ভাইবোন

 

আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ভেলা

 

দ্যা মোস্ট ইন্টারেস্টিং ম্যান ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড

 

ক্যামেরাবাজি

 

 

Leave a Reply