আমি যখন যেমন জীবনযাপন করি তখন সেটাই আমার কাছে ধরা দেয় সবচেয়ে সুন্দর রূপে । সম্ভবত এজন্যই কখনো আমি শৈশবে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবি না, নস্টালজিয়ায় ডুবে থাকার বিষয়টা আমার মধ্যে কম। তার চেয়ে, এই ‘প্রেজেন্ট মোমেন্ট’-টা উপভোগ করাটা একটা দারুণ ব্যাপার।

 

যাহোক, গতকাল অফিসের ব্যস্ততা কাটিয়ে বিকেলে গেলাম শিল্পকলা একাডেমীতে লোক নাট্যদলের নতুন মঞ্চনাটক ” আমরা তিনজন ” দেখতে। এটি মূলত তিন বন্ধুর একই সময়ে একসঙ্গে একটি মেয়েকে ভালোবাসার গল্প। বুদ্ধদেব বসুর লেখা এ গল্পটির নির্দেশনায় ছিলেন লিয়াকত আলী লাকী। গল্পটা এমন –

 

১৯২৭ সালের পুরানা পল্টনে তিন বন্ধু বিকাশ, অসিত আর হিতাংশু একসঙ্গে অন্তরা নামের একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে। আর প্রেমে পড়লেই ভেতর বয়ে চলে চোরাস্রোত, ভালো লাগে প্রেমিকার সান্নিধ্য, তাকে ডাকতে ইচ্ছা হয় মধুরতম নামে – সে তাড়না থেকেই ওরা তিনজন মেয়েটার নাম দেয় ‘মোনালিসা’ আর তাকে ঘিরেই মেতে থাকে তিন বন্ধু, যদিও যাকে নিয়ে এতকিছু সে থাকে সবকিছুর অগোচরে।

 

ঘটনাচক্রে অন্তরার পরিবারের সাথে আলাপ হয় এই তিন বন্ধুর। মোনালিসা টাইফয়েডে একমাস অসুস্থ থাকার সময়ে এই তিন বন্ধু দিনরাত সেবা করে একসময় সারিয়ে তোলে অন্তরাকে। মেয়েটার সাথে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওদের – এমনটাই ভেবে নেয় ওরা।

 

তবে এ ভুল ভাঙ্গে যখন অন্তরার বিয়ের কথা পাকা হয় এবং বিয়ে করে সে হাসিমুখে চলে যায় কলকাতা। তাই ভালোবাসার বিপরীতে ভালোবাসা পাওয়ার যে স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা তা পূরণ হয় না তিন বন্ধুর কারো। কষ্ট তো হয়, তবুও একবার ভালোবেসে ফেললে আর ফেরার পথ থাকে না বলেই হয়তো বিকাশ, অসিত আর হিমাংশু ভুলতে পারে না অন্তরাকে।

 

অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ঢাকায় ফিরলে ওরা অন্তরাকে ঘিরে থাকে আবার। ওর বাড়িতে গিয়ে ভালো-মন্দের খবর নেয়, ওর ব্যথায় ব্যথিত হয়। ও যাতে ভালো থাকে তার সবরকম চেষ্টা করে। কিন্তু সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অন্তরা – যাকে তিনবন্ধু ভালোবেসে মোনালিসা বলে ডাকত – মৃত্যুবরণ করে।

 

নাটকটি শুরু হয় হুইল-চেয়ারে-বসা বিকাশের বৃদ্ধ বয়সের জবানীতে। তারপর ফ্ল্যাশব্যাক; যেখানে সিন আর ন্যারেটিভের দুর্দান্ত মিথস্ক্রিয়া। সেখান থেকে ঘটনার ঘনঘটায় আবার বর্তমানে ফিরে এসে গল্পের ইতি টানা।

 

প্রতিটি চরিত্রের অভিনয় মানানসই, বিশেষত বিকাশের চরিত্রের অভিনয় অতুলনীয় লেগেছে। অন্তরার চরিত্র নিয়ে আরো কাজ করার আছে বলেই মনে হলো।

 

নান্দনিক মঞ্চসজ্জা, সেই সাথে চমৎকার সেট ম্যানেজমেন্ট আর সংগতিপূর্ণ আবহসংগীত নাটকটিকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছে। সাউন্ড সিংক্রোনাইজেশন আর লাইট – এর কাজ পরবর্তী শো-গুলোতে আরো ভালো হবে নিশ্চয়ই।

 

নাটক দেখা শেষ করে রিকশায় কিছুক্ষণ টই টই করে তারপর বাড়ি ফিরলাম। ঢাকার রাস্তা রাত বারোটাতেও জ্যাম থাকে। তবু ভালো লাগে এই রাত করে বাড়ি ফেরা। ফিরে বাবা-মা’র হাসিমুখ দেখা।

 

যে কথা শুরুতে বলছিলাম, আমার এই  দৈনন্দিন জীবন ; কখনো নাটক দেখা, কখনো রিকশায়, কখনোবা শিল্পকলার ছাদে, বাতিঘরে, কিংবা খোলা মাঠে সবুজ ঘাসের উপর, অথবা ফুটপাতে হাঁটতে হাঁটতে যে মুহুর্তগুলো আমাকে ঘিরে থাকছে, কিংবা আমি যাকে ঘিরে থাকছি – এসব অমূল্য।

 

এই সময় অমূল্য, কারণ এই একটি জিনিসই একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। তাছাড়া জীবন তো কিছু সময়ের সমষ্টিমাত্র এবং কেউ জানে না অপর পৃষ্ঠায় কি আছে ! কিছু নেই কিংবা আছে – কে জানে !

 

তাই রাত নামিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমার আনন্দ হয় এই ভেবে যে, আজ চমৎকারভাবে বাঁচলাম।

 

এই আনন্দময় দিনরাত্রি চিরকাল এমনি থাকুক।

 

Leave a Reply