মধুসূদন বাবু মারা যাওয়ার সংবাদে মুকুল একেবারে ভেঙ্গে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে ঢলে পড়ল আমার কাঁধে। আমি কোনোরকমে ওর মাথায় হাত রাখলাম। বললাম, শান্ত হ মুকুল, কেউ যায় কেউ আসে; এইত নিয়ম। কাদিস না। ট্রেন চলে আসবে এখনই। আমরাও তো যাচ্ছি।

 

একথা বলে আমি প্লাটফর্মের দিকে তাকালাম।  কাকভেজা হয়ে আছে প্লাটফর্ম; আর সেই সাথে এখানে নিয়ে আসা তরি-তরকারীও। বেগুনের গায়ে শিশিরকণার মত বৃষ্টি জমছে, যেন ওগুলোও কাঁদতে শুরু করেছে। সময়টা আন্দাজ করা যাচ্ছে না। বোধহয় সকাল; আবার বিকেলও হতে পারে। সন্ধ্যা হলেও অবাক হবার কিছু নেই। সামনেই বড় বড় ডালায় সবজি নিয়ে বসে আছে ক’জন চাষী। ওদেরও ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা। অন্য সময় হলে প্লাটফর্মে পা ফেলা দায় হতো। কিন্তু এখন বর্ষা। তাই চাষীদের ভীড় নেই। ডুবে গেছে সব। আলু-পিয়াজ-রসুন, ভাঙা ছাতা, উদোম শরীর, আশা-আকাঙ্ক্ষা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবকিছু। ওদের সবকিছু ডুবে যায়। ওরা কী নিয়ে বাঁচবে – এমন একটা ভাবনা হঠাৎ আমাকে দুলিয়ে দিয়ে গেল। একজন চাষীর সাথে কথা বলে জানলাম ওরাও যাবে উত্তরে। ট্রেন আসতেও আর বেশি বাকি নেই। বেশ ভালো হলো। আমরাই তাহলে উত্তরের পথের একমাত্র যাত্রী নই।

 

স্যাঁতস্যাঁতে অজোঁপাড়াগেয়ে প্লাটফর্ম, চাষীদের ছেঁড়া গেঞ্জি, বেগুনের গায়ে মিছরির মত জলকণা, ছাতার সাথে সংগ্রাম করতে করতে কোমর ভেজানো দু’একজন লোক; সব মিলিয়ে অদ্ভুত লাগছে। কিন্তু এসবের মধ্যে আচমকা মধুসূদন বাবুর মৃত্যুর সংবাদটা কেমন গড়বড় করে দিল। ঘাড়ের উপরে মুকুলের কান্নাভেজা মুখ। ওকে কী বলে সান্ত্বনা দিতে পারলে আমার ভালো লাগবে – তাই ভাবছি। কাউকে সান্ত্বনা দেয়ার মধ্যে এক ধরনের মিহি আনন্দ আছে। মধূসুদন লোকটার সাথে ওর সম্পর্কটা ঠিক আন্দাজ করতে পারছি না। তাই সান্ত্বনা বাক্য খুঁজতে সমস্যা হচ্ছে। তবে মানুষের মৃত্যুতে এত আহত হবার কিছু নেই। ঠিক যেমন জন্ম ব্যাপারটাও খুব একটা আনন্দের কোনো ঘটনা নয়। মৃত্যুও তেমনি। এগুলো খুবই প্রাকৃতিক বিষয়। জন্মেছ যখন, তখন জন্মদান করে মরে যাও – ব্যাস! চক্র চলমান থাকুক। পৃথিবী এগিয়ে যাক। মানুষসহ সবার ক্ষেত্রেই  নিয়ম এক। যাহোক, মুকুলকে এখন এসব বলা বোধহয় ঠিক হবে না। আবেগের সময় মানুষ বিবেচনাবোধ হারিয়ে ফেলে। যুক্তি আর আবেগ পরস্পর বিপরীত শব্দ বলেই তো চিরকাল জেনে এসেছি।

 

 

 

প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা। মেঘের গা চুইয়ে ঝিরিঝিরি জল পড়ছে । অদ্ভুত কান্নার সুর যেন সমস্ত প্রকৃতিতে। আমি মুকুলকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করেছি – মুকুল শক্ত হ, একজন মানুষের মৃত্যুতে কিছু যায় আসে না। কথাটা বলেই মনে হল – বাহ, বেশ বলেছি তো। কথাটা নিজের হলে নিজেকে দার্শনিক জ্ঞান করতাম। আসলে কথাটা আমার নয়। কোনো একটা বইতে পড়েছিলাম। মহাবিশ্বের জটিল এই নিয়মের মধ্যে একজন ব্যক্তির মৃত্যু আদতেই কোনো প্রভাব ফেলে না। কোনো ছন্দপতন ঘটে না প্রকৃতিতে। সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে – এরকমই কিছু একটা লেখা ছিল। কথাটা খুবই সত্য। মেনে নেয়া কঠিন – এমন সত্য। যেসব সত্য বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়। যেগুলো আমরা  ঘৃণা করি। অথচ আমাদের পছন্দ না হলেও, মৃত্যু আমাদেরকে ভালোবেসে তুলে নিয়ে যায়।

 

আমরা এক অদ্ভুত ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছি। ট্রেনটা কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। আমাদেরকে নিয়ে যাবে উত্তরে।

 

ইদানিং ট্রেনে যাত্রীর সংখ্যা নেই বললেই চলে। একটু আগে আমরা অন্য একটা স্টেশনে অপেক্ষা করছিলাম। সেখান থেকে একটা ট্রেন উত্তরমুখি চলে গেল; সেটাতেও হাতে গোনা কিছু লোক ছিল। আমাদের ইচ্ছে ছিল ওই ট্রেনেই আমরা চলে যাব। অ্যাটেনডেন্টকে খুব করে অনুরোধ করলাম, দেখুন আমাদের টিকিটটা পরের ট্রেনের। কিন্তু আমরা এটাতে যেতে চাচ্ছি। গন্তব্য যেহেতু একই, তাই আপনি অনুমতি দিলে খুব সুবিধা হত। সময়টা বেঁচে যেত। তাছাড়া আমাদের কোনো সিট প্রয়োজন নেই। দাঁড়িয়েই খুব যেতে পারব। ট্রেনটা তো প্রায় খালিই যাচ্ছে…

 

প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে অ্যাটেনডেন্টের সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে ট্রেনটা চলে গেল, আমি কিংবা মুকুল কেউই টের পেলাম না। যেন নিঃশব্দে বেড়ালের মত চলে যাওয়া। আমরা যখন রেল লাইনের উপরে তাকালাম, দেখলাম একটা বগিবিহীন ট্রেনের ইঞ্জিন ভোঁস ভোঁস শব্দ করে বৃষ্টির পানিতে ভেজার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখনও মধুসূদন বাবুর খবরটা আমরা পাইনি। আমি মুকুলকে বললাম, মুকুল চল, একটু তাড়া করে হাঁটলে ট্রেনটা বোধহয় ধরতে পারব।  সামনেই আরেকটা স্টেশন, সেখানে অবশ্যই থামবে। তারপর দুজন দৌড়াতে শুরু করলাম। এবং দৌড়ে দৌড়েই এই স্টেশনে আসা। আগের ট্রেনটা নেই, কেউ কিছু বলতেও পারল না। ট্রেন কখন আসে, কাকে নিয়ে কখন যায়– কে তার খোঁজ রাখে ! আমরা টিকিট কাউন্টারের দিকে কাউকে জিজ্ঞেস করব বলে এগিয়ে যাচ্ছি; আর তখনই দেখলাম স্টেশনের দেয়ালে পোস্টারে লেখা – ‘রেল কর্মকর্তা মধুসূদন বাবুর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত’।

 

 

 

আমাদের যাত্রা কেন এবং কখন শুরু হয়েছিল – তা ঠিক মনে নেই। শেষ যতটুকু মনে পড়ছে – আমি আর মুকুল ট্রেনের টিকিট কেটে কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছি। উত্তরের কোনো একটা যায়গায় যাব। যদিও ঠিকানা নির্দিষ্ট নেই। তবে আশা এই যে, জায়গাটা আমাদের খুব ভালো লাগবে। সেখানে সুন্দর কচি কচি ঘাস থাকবে। হরিণ চরে বেড়াবে সে ঘাসের ভেতর পা ডুবিয়ে; মুখ ডুবিয়ে। সেখানে গাছ থাকবে, গাছে গাছে পাখি থাকবে। পাখির কণ্ঠে থাকবে গান।  আমাদের মনের মধ্যে যেমন শান্ত সবুজের ছবি আঁকা, ঠিক তেমনি চির সবুজের দেশে আমরা পৌছে যাব।

 

যাত্রার শুরুতে আমরা আকাশ দেখিনি। কেউ দ্যাখেও না। যাত্রাকালে আকাশের রঙ তাই আমাদের স্মৃতিতে নেই। হয়তো রোদ ছিল কিংবা মেঘ। কিন্তু এখন আমাদের বারবার আকাশের দিকে তাকাতে ভালো লাগছে। সময়টা যদিও আন্দাজ করা যাচ্ছে না। আর তাছাড়া আমাদের কারো কাছে ঘড়ি নেই। তাতে কী? ট্রেনটা চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আমরা ‘কিছুক্ষণ’ নামক ‘অনন্ত সময়’ পথের সাথে চোখ বেঁধে রাখলাম প্রতীক্ষায়।

 

ইলশে গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে এখনো। মুকুল বারবার চোখ মুছছে। ওর চোখের নদীতে বন্যা। ওকে খুব বলতে ইচ্ছে করছে, এতো কাঁদছিস কেন? তুইও তো একদিন মরে যাবি? কিন্তু না, থাক। কান্না দিয়ে মৃত্যুকে আটকানো যায় না – এ সত্য ওর এখন না জানলেও চলবে।

 

 

 

দরজায় হালকা কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। মৃদু ঠক ঠক। কিন্তু সর্বনাশ যা হবার তা হয়েই গেল; ঘুমটা ভেঙে গেল। অনিবার্যভাবে স্বপ্নটাও। দরজা খুলে দেখি ফারুকী দাড়িয়ে আছে। ফারুকী আমাদের ব্লকেই থাকে। মাঝে মাঝে আমার রুমে আসে গল্প করতে। গল্প করতে বললে ভুল হবে, বলা উচিত হাসতে আসে। ওর মতো অকারণে হাসতে পারা মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। ওকে দেখলে মনে হয় লাফিং বুদ্ধা। হেসেই যেন উড়িয়ে দেবে পৃথিবী। কিন্তু এত ভোরে ও কোনোদিনও আসে না। আমার সদ্য ঘুম ভাঙা চোখ দেখে ফারুকী বলল, কি ব্যাপার ঘুমাচ্ছিলি… আমি ভাবলাম জেগে আছিস।

 

বললাম, না। ঠিক আছে। ভেতরে আয়, জরুরী কিছু? ফারুকী পরে আসবে জানিয়ে বিদায় নিল। আমিও আর দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলাম না। বরং খুব দ্রুত আবার বিছানায় ফিরে এলাম, স্বপ্নটার বাকী অংশ দেখব বলে। ভাবলাম – এমনটা তো খুব একটা হয় না। মুকুলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলাম। এতোদিন পর। আর তাছাড়া এতো স্পষ্ট স্বপ্ন তো কখনো দেখিনি। আমি ফ্রয়েড-ইয়ং পড়েছি। তাই স্বপ্ন আমাকে বিভ্রান্ত করে না কখনোই। কিন্তু আজ কিছুতেই আর ঘুম এলো না। বুঝলাম, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন জোড়া লাগে না। অগত্যা বিছানা ছেড়ে উঠলাম। স্বপ্নটা যাতে ভুলে না যাই, তাই দ্রুত কাগজকলম নিয়ে লিখতে বসে গেলাম। আমি এর আগে কখনো স্বপ্ন লিখে রাখিনি। লিখতে অবশ্য ভালোই লাগছিল। অনাস্বাদিত অনুভূতি, যেন অন্য জগতে ভ্রমণের এক অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার কথা লিখছি। মনে একটা ক্ষীণ আশাও ছিল, এটাকে একটু এদিকওদিক করে, যাকে বলে লেখকের কল্পনা মিশিয়ে, একটা গল্প করে তুলতে পারব।

 

লিখতে লিখতে হঠাৎ মনে হল, যাকে নিয়ে লিখছি তাকে একটা ফোন দিলেও তো হয়। কতোদিন আমরা ইথারের প্রাচীর ভেদ করিনি। কিন্তু এত সকালে কি ফোন দেয়া ঠিক হবে?

 

যদিও মুকুল আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, তবুও সে তো রূপকথার প্রথম বাক্যের মত – অনেক অনেক কাল আগের কথা। ওর সাথে যোগাযোগ নেই আজ বহু বছর। ফোন নাম্বার আছে; তবে কথা হয় না। অবশ্য আমার এমন অনেক বন্ধুই আছে যাদের ফোন নাম্বার ফোনবুকে আছে, এমনকি ফেসবুকের বন্ধুতালিকায়ও তারা আছে। অথচ বছরের পর বছর তাদের সাথে দেখা হয় না, কথা হয় না। একটা ক্ষুদেবার্তাও কেউ পাঠায় না। আমিও না। অলিখিত দূরত্বের দেয়ালে আমরা সভ্য নাগরিকেরা আপাদমস্তক বন্দী। মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ স্বার্থের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয়। মুকুলের আর আমার বেলায়ও বোধহয় এটাই হয়েছে। একই গ্রামে থেকেছি, একই স্কুলে পড়েছি। তারপর সেই কলেজ জীবন থেকে, যখন আমরা ভিন্ন ভিন্ন কলেজে ভর্তি হলাম, আর কোনো যোগাযোগ নেই। অর্থনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত – কোনো যোগাযোগই না;  কিছুই না। তবে জানিনা কেন – বহুবছর পর আজ হঠাৎ স্বপ্নযোগ হলো।

 

মুকুলকে ফোন দেব কি দেব না ঠিক করতে পারছি না। এতদিন পর ওর গলার স্বর কি আমি  চিনতে পারব? না পারারই কথা। মানুষ প্রতি দশ বছরে আদ্যোপান্ত বদলে যায়। শরীরের ভেতরে নতুন শরীর হয়। আর মন? মনের বদল তো ক্ষণে ক্ষণে। তার জন্যে দশবছর অপেক্ষা লাগে না।  মুকুলের সাথে আমার তো প্রায় দশ বছর জানাশোনা নেই। যদি ওর আমাকে মনে না থাকে? যদি চিনতে না পারে, কীভাবে চেনাবো? অপরিচিত জনের কাছে নিজের পরিচয় দেয়া যায়, নিজেকে চেনানো যায়। কিন্তু পরিচিত বন্ধুর কাছে ? কথার কৌশল জানা লোকেদের অবশ্য সম্পর্ক বিনির্মানে কালক্ষেপণ করতে হয় না। কিন্তু আমার হয়। বার বার ভাবতে হয়। মনের মধ্যে কোথায় যেন দ্বিধা রয়ে যায়। ও যদি ভাবে, আমার নিজেরই কোনো স্বার্থে ওকে আজ পুরোনো স্মৃতির ভেতরে টেনে নিয়ে যেতেই, আমি কথার সেতু বাঁধতে চাইছি। স্বপ্নের ভেতরে কী এক ইঙ্গিত হঠাৎ আজ মনের হাওয়া বদল করে দিল। ভয় হচ্ছে, যদি ফোন দিয়ে শুনতে হয়, ওর বাবা আজ মারা গেল। যদি স্বপ্ন সত্যি হয়। যদি ভদ্রতা রক্ষার্থে প্রায় ভুলে যাওয়া বন্ধুর পিতৃবিয়োগে আমাকেও সমব্যাথী হতে হয়।

 

কেন ভুলে যাওয়া বন্ধুর মুখ এতদিন পর স্বপ্নের জালে বাঁধা পড়তে হবে ? দ্বিধাগ্রস্ত মনে ফোনের দিকে হাত বাড়াব কিনা ভাবতেই সেটা সশব্দে বেজে উঠল। আর সাথে সাথেই খবর পেলাম, আমার বাবা কিছুক্ষণ আগে ট্রেনে কাটা পড়েছেন।

 

 

 

ভেজা চোখে জানালায় তাকিয়ে দেখছি, বাইরে ইলশেগুড়ি বৃষ্টি। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। জীবন-মরণ নিয়ে কোনো দার্শনিক তত্ত্বে আমার আগ্রহ নেই। নিজেকে নিতান্তই সাধারণ আবেগপ্রবণ মানুষ মনে হচ্ছে।

 

এখন আমি জানালায় চোখ রেখে কাঁদছি। আর মনে করার চেষ্টা করছি, আমার বাবার সাথে জীবনানন্দ দাশের কখনো পরিচয় ছিল কিনা।

 

Leave a Reply