You Vainly seek into the Causes of things;
Why not appreciate and enjoy what they produce?
Therefore I say _ to neglect man and speculate about Nature
Is to misunderstand the facts of the Universe.

~ Xun Qing

 

 

মল্লিকের বিয়েটাই বাঁধ সাধলো!

 

আমিতো ঠিক করলাম জলেই যাব। সামনের শুক্রবার। সারাদিন জলমগ্ন থাকব। রাতটাও। এমন যায়গা যেখানে রাতভর জেলেরা মাছ ধরবে। আমি কোনো একটা নৌকোতে ঠিক আশ্রয় করে নেব। দরকার পড়লে টাকা-পয়সা দেব। তবু রাতটা আকাশভর্তি নক্ষত্রের নিচে কাটাব জলের বিছানায়। তাকাব আকাশে। তাকাব জলে। হাওয়া বইবে মৃদুমন্দ। নৌকা দুলবে। আমিও দুলব। আকাশে চাঁদ থাকবে। জ্যোৎস্না থাকবে। রান্না হবে নৌকায়। হয়তো চালে-ডালে খিচুড়ি কিংবা ডাল-ভাত আর মাছ। মাঝির সাথে এটা-ওটা আলাপ করতে করতে খাব। শান্ত জলের মধ্যে হঠাৎ মাছের আওয়াজ হাপুস-হুপুস। খেতে খেতে সচকিত দৃষ্টি ছোঁয়াব জলে। হাসব, হাসাবো।

 

যাহোক, স্থির করে ফেলেছি সামনের শুক্রবারই জলভ্রমণ। মাছ-মাঝিদের সাথে কবিতার ক্লাস। ফেসবুক-টুইটারে তালা। তালা অফিসের কেঁচিগেটে। তালা টেলিফোনে, সামাজিক বাদ-বিবাদে। সবকিছু তালা মেরে মন খুলে বেরিয়ে যাব পথে। পথ থেকে জলে। জল আর হাওয়ায়।

 

স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এক কাপ কফি হাতে অন্তর্জাল আঁতিপাঁতি। কোথায় যাওয়া যায়?  এমন কোথাও যেতে হবে যাতে যাত্রা শেষে দ্রুত আবার যোগ দিতে পারি কোলাহলে। আমার কোলাহলকেন্দ্র আপাতত রাজশাহীতে। ব্যাংকে চাকরি করে খেয়েপরে বাঁচি। লাভের মধ্যে এখন বর্ষাকাল।  আকাশের বিরহ-বেদনা চুইয়ে পড়ছে যখন তখন। প্রথমেই মনে এল চলন বিলের কথা। কিছুক্ষণ গুগলিং করি। সিদ্ধান্ত নেই যাব তাড়াশ-গুরুদাসপুরের বিলাঞ্চলে। নৌকায় বাতাসের সাথে কাটাকুটি আর রাতভর জলের আরশিতে নক্ষত্রের রূপ দেখব। পরিচিত বন্ধুকে ফোন দেই – কিরে চলন বিলের খবর কী? খবর ভালো তবে পানি আশানুরূপ না। বন্ধু পরামর্শ দিল সপ্তা দুই পরে যাওয়ার। আমার বিরস বদন। বললাম – আশেপাশে জলজ হবার যায়গা নেই আর? এই ধর, নৌকা করে সারাদিন?

 

জায়গা অবশ্য পাওয়া গেল। নাম পাটুলের হালতিবিল। আদিখ্যেতা করে কেউ বলে মিনি-কক্সবাজার। নাটোর থেকে ৮ কিলো দূরে। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। মাঝখানে সাবমার্সিবল রোড। রোডের উপরে হাঁটুভেজা হয়ে বিলের বাতাস খাও কিংবা নৌকা করে জলচর হও – তোমার ইচ্ছে। যাহোক, এক রকম সিদ্ধান্ত নিলাম। হালতিবিলই সই। আগে তো যাই। দরকার হলে ওখান থেকে চলে গেলাম পদ্মার স্রোতে।

 

দিবারাত্রির জলসূচি ঠিক করে ফেললাম। খুব ভোরে বের হব। রাজশাহী টু নাটোর – নাটোর টু হালতিবিল। মাত্র দেড় দুই ঘণ্টার মামলা। তারপর নির্জনতা। শুধু জল আর বাতাসের মিতালি। মানবশব্দ স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর ভেবে একলা হব। গা ভেজাব জলে। তবে তার আগে একটা যুতসই নৌকা খুঁজে নেব। মাঝির সাথে মিতালি করে জলের গায়ে জাল ফেলব। জালের মধ্যে জলবাসিন্দা। আমাদের চোখে আনন্দ। আহা, ভাবতেই মন ভরে উঠছে।

 

উপরে থাকবে বিশাল আকাশ। আকাশে মেঘের ভেলা। বর্ষাকাল বলেই মেঘদূতের সদম্ভ আগমন। অবিরাম বারিপাত। ভিজে যাচ্ছে নৌকা। ভিজে যাচ্ছে বিলের জল। জলের ওপরে জল পড়ার অদ্ভুত শব্দ। মাঝি জালে কয়েদ করা বাসিন্দাদের নিয়ে ব্যস্ত । আমি ব্যস্ত বুক ভরে শ্বাস নিতে। চোখ ভরে গিলে নিতে স্নিগ্ধতা। আকাশে বিদ্যুতের আলো ঝলকানি আমাদের ক্ষুদ্র নৌকাকে চোখ রাঙিয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। আমরা জলমেখে উদাসীন আমাদের কাজে। মাঝি – জীবিকার প্রয়োজনে, আর আমি – জীবনের প্রয়োজনে। কিন্তু এর মধ্যে মল্লিক ঢুকে গেল হড়হড়িয়ে। একেবারে বিনা নোটিশে।

 

 

**

 

মল্লিক আমার পুরনো বন্ধু। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে ঘনিষ্ঠতা। এক মেসে থেকেছি। এক সাথে শুয়ে বসে ইংরেজি সিনেমার চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেছি। তো সেই মল্লিকের ফোন। তাও আবার বৃহস্পতিবার রাতে। আর ফোন দিয়েই বলে কিনা – বিয়ে করব দোস্ত, তুই সাক্ষী থাকবি। আমি বিব্রত। মাস চারেক পরে ফোন। তাও আবার ফোন করেই বিয়ের সাক্ষী হতে বলা! বুঝলাম, ঘটনা গুরুত্বর। সাক্ষাতে সব শুনতে হবে। বললাম – আগে রুমে আয়। তারপর দেখতেছি।

 

মল্লিক কেবল চাকরিতে ঢুকেছে। কি একটা কোম্পানির মার্কেটিং এ। পোস্টিং রাজশাহীতে। তবে একই শহরে থাকলেও দেখা হয় না। আমরা আধুনিক ব্যস্ত মানুষ। এত সময় নেই। তবুও বন্ধুত্ব প্রশ্নাতীত। মল্লিকের ইচ্ছে ছিল দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর। অন্ত্যত মেসের দিনগুলোতে ওর মুখে তাই শুনতাম। চাকরি করে টাকা জমাবে, আর তারপর দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবে। বিয়ে-থা করবে কিন্তু তার আগে ওর বিশ্ব দেখা চাই। আমরা তখন খুব হিসেবী ছিলাম। কোন চাকরিতে বেশি টাকা উপায় করা যাবে তাই নিয়ে ভাবতাম। যাতে যৌবন থাকতে থাকতে টাকা কামিয়ে, বিশ্বটাকে একটা চক্কর মেরে আসতে পারি।

 

তাই তো অবাক হচ্ছি। এত শীঘ্রই কেন বিয়ে করতে চাচ্ছে বেচারা। এখনই বিয়ে করাটা আমার দৃষ্টিতে অর্থসংগত নয়। আগে কবছর চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়া। তারপর নাহয় … যাকগে । মল্লিক আসলো রাত আটটার দিকে। হাসি হাসি মুখ। দেখে বোঝা যায় আসন্ন বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তার বিন্দুবিসর্গও নেই।

 

হঠাৎ বিয়ের সিদ্ধান্ত, ঘটনা কি রে?

মল্লিকের মুখে হাসি – হ দোস্ত, কালকেই বিয়া করব। তুই সাক্ষী থাকবি। পারবি না?
— শালা, বিয়ে করার আর দিন পেলি না । ভাবলাম কালকে একটু ঘুরতে বের হব!
— পরে ঘুরতে যাইস। আগে আমার কাজটা শেষ হোক।
— কারে বিয়ে করতেছিস? ব্যাপার কি…

 

মল্লিক খাটের উপর পা উঠিয়ে বসল। হেলান দিল দেয়ালে। আমি ওর পিঠের পেছনে একটা বালিশ দিলাম। বললাম – মেয়ে কোথাকার?

 

মল্লিক আমাকে ওর সামস্যাং জে-সেভেনের গ্যালারি ঘুরিয়ে আনল। মেয়েটা ভালো। সুশ্রী। মল্লিকের সাথে মাননসই। আমার ভালো লাগল। বললাম – কত দিনের? মল্লিক জানাল – এইত মাস চাইর হবে। আমি অবাক হলাম – বলিস কি! এত তাড়াতাড়ি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলি। আমার মা আমারে বিয়ের কথা বলতেছে দুই বছর ধরে। আমি অনড়। আর তুই কিনা চার মাসের প্রেমে কুপোকাত। যাহোক মেয়ের চাপে পড়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস না তো? যদি তাই করিস তাহলে আমি বলব বিয়ে করিস না? আর যদি দুজনে মিলে হাসিমুখে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকিস তাহলে আমার কোনো মতামত নাই।

 

মল্লিক জানাল ওরা দুজনে মিলেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো চাপটাপ নেই। ওরা চাচ্ছে সম্পর্কটাকে লিগালাইজ করতে। মেয়ের বাড়ি উত্তরবঙ্গে। জয়পুরহাট। বাবা-মা দুজনেই শিক্ষকতা করেন। মেয়ের ছোট একটা ভাই আছে। ক্লাস এইটে পড়ে। মেয়ে ভালো। কোনো ব্যাড রেকর্ড নেই। মানে মল্লিক গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে কোনো কিছু পাইনি। আগে একজনের সাথে কিছুদিন প্রেমের-মত কিছু একটা ছিল। তা সেরকম তো মল্লিকেরও ছিল। তাই ওর যুক্তিতে মেয়েটা ওর পছন্দসই। মেয়েটার মধ্যে ‘কিছু একটা’ আছে। একে বিয়ে করা চাই।

 

আমি বললাম – ভেরি গুড। কিন্তু তোর ফ্যামিলি?

 

মল্লিক বলল মেয়েটাকে ওদের বাড়ি থেকে ঘুরিয়ে এনেছে কিছুদিন আগে। ওর মা খুব পছন্দ করেছে। যদিও সেখানে মেয়েটা ওর বন্ধু হিসেবে গিয়েছিলো। তবু মায়ের চোখ ফাঁকি দেবার মত বড় কেউ কখনো হয় না। তা না হলে ওর মা কেন মেয়েটাকে শাড়ি, জুতো, জামা ইত্যাদি কিনে দেবে। যাহোক, আমি গদগদ হয়ে বললাম – তাহলে পারিবারিকভাবে বিয়েতে সমস্যা কি?

 

মল্লিক বলল – দীপ্তি কেবল ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। ওর ফ্যামিলি এখন বিয়ে দেবে না। তাছাড়া আমিও সেদিন চাকরি পেলাম। এখন বাড়িতে বিয়ের কথাটা বলতে লজ্জা পাচ্ছি।

 

মল্লিকের বাড়িতে ওর মা আর ভাই-ভাবী থাকে। তারা যেহেতু মেয়েকে – বন্ধু হিসেবে হোক আর যাই হোক – পছন্দ করেছে তাহলে পারিবারিকভাবে বিয়েতে সমস্যা নেই। আর মল্লিক ছেলে ভালো। মেধাবী। নটা-পাঁচটা চাকরী করে। সুতরাং এখন বিয়ে না দিলেও পরবর্তীতে মেয়েদের পরিবারের আপত্তি হবার কথা না। তাই আমার হিসাব মতে এ বিয়েতে ‘সাক্ষী’ থাকাই যায়। আর তাছাড়া আমার সাক্ষী দেবার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দ্বিতীয়বর্ষে থাকাকালীন এক বন্ধুর বিয়েতে আমার সাক্ষী-জীবনের হাতেখড়ি। তারা অবশ্য এখনও ফেভিকল-জুটি। সুতরাং বলা যায়, আমি সাক্ষী হিসেবে লা-জবাব। সেক্ষেত্রে আমার জলমগ্ন হবার প্ল্যানটা মাঠে মারা যায়। তা যাক। বন্ধুর বিয়ে বলে কথা। আমি জলমগ্নতা বিসর্জন দিয়ে বললাম – প্ল্যান কি? কিভাবে কোথায় কেমন করে বিয়ে করবি এ-টু-জেড জানা। আর রাতে অন্য কোথাও যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে আমার রুমেই থাক। কাল সকালে যেখানে যাবার যাস।

 

মল্লিক থাকার ব্যাপারে নিমরাজি হতে হতে শেষে রাজি হল। তারপর পরিকল্পনার কথা বলল। মল্লিকের পরিকল্পনা এমন –  সকালে আমার এখান থেকে সোজা রুমে যাবে। সেখান থেকে গোছগাছ করে, ভার্সিটির হল থেকে দীপ্তিকে নিয়ে সাড়ে এগারোটার মধ্যে কাজী অফিস। আমাদেরকে লোকেশন বলে দেবে। আমাদের মানে – আমি, রুমন আর মল্লিকের আরেকজন বন্ধু। এই তিনজন। তারপর – অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে – সাড়ে বারোটার মধ্যে লারে-লাপ্পা। বিবাহ কমপ্লিট। আপাতত আমরা এই ক’জন ছাড়া কেউ জানবে না।  বছর দুয়েক পর পারিবারিকভাবে জানাজানি হবে। হবে অনুষ্ঠান-সামাজিকতা-সাত-সতের।

 

 

***

পরিকল্পনা মাফিক বিবাহ সম্পন্ন হল। মল্লিকের এক বন্ধু ‘উকিল-বাপ’ হল। আমি আর রুমন সাক্ষী হলাম। সেই প্রথম আমরা দীপ্তিকে দেখলাম কাজী অফিসে। কাজী সাহেব মধ্যবয়স্ক, খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ির লোক। কণ্ঠস্বর মধু-মিষ্ট। বিবাহের রেজিস্টার খাতার ঈষৎ-সবুজ পাতায় সব প্রয়োজনীয় তথ্য লিখছেন। আমরা উনার মুখোমুখি ছোফায় বসে আছি। পাশের খাটের মত আসনে পাশাপাশি মল্লিক আর দীপ্তি। ওই অল্প সময়ের মধ্যেও মেয়েটার সাথে মল্লিকের ছোট ছোট খুনসুটি। একটু খবরদারি। মাঝে মধ্যে লাজুক চাহনি। সবমিলিয়ে ওদের দুজনকে মেড-ফর-ইচ-আদার মনে হল। আমার ভালো লাগছে। সুন্দর কিছুর সাক্ষী হতে ভালো লাগে। ভাগ্যও লাগে। সত্যিকারের দীপ্তিময় হোক ওদের জীবন। আশীবার্দ করলাম। মিষ্টিমুখ শেষে বন্ধুকে কনগ্রাচুলেট করে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। দীপ্তি নামের একটা বোন-কাম-ভাবী পেলাম।

 

তারপর দুপুর গভীরে গড়াল। আমরা মল্লিকের বিয়ের অনানুষ্ঠানিক খানা খেতে একটা রেস্টুরেন্টে পদধূলি দিলাম। আর উপাদেয় খাবারগুলি অর্ডার দিলাম। মল্লিক আর দীপ্তি পাশাপাশি বসেছে। ওদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হয়েছে এখন। লিখিত সম্পর্ক। চুক্তি। ধর্মীয় দিক দিয়ে ‘পবিত্র বন্ধন’। খাবার খেতে খেতে নানা কথার মাঝে বারবার মনে হচ্ছিল – কালিমা পড়ে ‘সজ্ঞানে-স্বেচ্ছায়’ ‘বিসমিল্লাহ-কবুল’ বলার কি অদ্ভুত ক্ষমতা। দুটো মানুষকে একছাদে থাকার বৈধতা দেয়। আর তা না হলে ‘মহাভারত অশুদ্ধ’ হয়। আমার যুক্তিবাদী মনের উপর এইসব সামাজিক ধ্যান-ধারণা হাসাহাসি করে।

 

খেতে খেতে মল্লিক চিকেন-কারী উঠিয়ে দেয় দীপ্তির প্লেটে। দীপ্তি স্বল্পাহারী মেয়ে। বেশি খেতে পারে না। ওদের দেয়া-নেয়া আড়চোখে দেখি আমি। আমার ভালো লাগে। এই মারদাঙ্গা সমাজে ভালোবাসাবাসিরও দরকার আছে বৈকি।

 

খাওয়া শেষে আমরা যার যার গন্তব্যে পা ছোটাই। যাওয়ার আগে দীপ্তিকে বলি – আমরা তোমার ভাই হলাম। যেকোনো দরকারে মনে করবে। দীপ্তি বোধহয় জানে এগুলো কথার কথা। এ সমাজে কে কার প্রয়োজনে কাজে আসে। কে কার খোজ রাখে। দীপ্তি মুক্তো-দাঁতে রোদ ছড়ায়। তারপর আমাদের বন্ধুবর মল্লিকের সাথে রিকশায় অনাড়ম্বর ভঙ্গীতে বাতাস কেটে এগোতে থাকে।

 

ঘরে ফিরে টের পাই খাওয়াটা বেশি হয়ে গেছে। শেষে লাচ্ছিটা নেয়া ঠিক হয়নি। যাহোক সাবধানে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করি।

 

 

****

বেশ কয়েকদিন পর। বিকেলে ঝুম বৃষ্টি। আমি অফিস থেকে এসে চা নিয়ে বসেছি। বৃষ্টির গান শুনছি। মাঝে মাঝে বজ্রধ্বনি। এর মধ্যে মল্লিকের ফোন। ঝড় বাদলের মধ্যে আমাকে মনে পড়ল! ফোন ধরে বললাম – দাম্পত্য জীবন কেমন যাচ্ছে। মল্লিক জানালো – খুব ভালো। বলল – আমি আর দীপ্তি এখন চলনবিলে আসছি। নৌকায়। খুব ভালো লাগতেছে বন্ধু।

 

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। আমি জলাভূমি বিসর্জন দিয়ে বৃত্তবন্দী। আর ওরা জলের মধ্যে জলকেলিতে মগ্ন। এটাই জীবন। তবুও ভালো লাগল। যেন দৃশ্যটা আমার সামনে শরীর নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।  ওরা দুজন ছোট্ট একটা ছৈ-তোলা নৌকায়। চারিদিকে অথৈ জলতরঙ্গ। ঠাণ্ডা বাতাসের ছাট। ঝুম বৃষ্টির গান। মাঝে মাঝে বজ্রধ্বনি। দুজন মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে কাছাকাছি। চোখেমুখে হাসি। নির্ভয়। যেন নৌকাটা ওদের ভালোবাসার কুটির। বিলের জল যেন মহাকাল। ওরে দুজনে ছোট্ট ডিঙায় মহাকাল পাড়ি দিচ্ছে। ওরা মহাকালের সহযাত্রী। ভালোবাসার কাব্য লিখছে জলশরীরে। ছুঁয়ে দিচ্ছে পরস্পরকে। তলিয়ে যাচ্ছে মোহজালে। গভীরে। আরো গভীরে।

 

এ কদিনে জলস্রোতে বিলীন হবার কথা ভুলে ছিলাম। মল্লিকের ফোনে আবার জলটান অনুভব করছি। যাবো নাকি সামনের শুক্রবার! অনন্ত কাজের থেকে অদ্ভুত অবসর চুরি করে হবো নাকি জলান্তরী!

 

জলান্তরী হবার কথা মনে হতেই টেবিলের ড্রয়ার থেকে চৈতীর ছবিটা বের করলাম। ছবিটা দুদিন আগে মা পাঠিয়েছে। আমি যেন ছবিটা দেখে কিছু একটা জানাই। কিইবা আর জানাব। বিবাহিত জীবনে আমার অভক্তি। জেনেশুনে আমি শেকলে বাধা পড়তে চাই না। তাছাড়া বিয়ে ব্যাপারটাকে মানবজাতি-টিকিয়ে-রাখার অত্যাবশ্যকীয়-প্রক্রিয়া ব্যতীত আমার কাছে অন্যকিছু মনে হয় না। ব্যাপারটা ভয়ানকভাবে বায়োলজিক্যাল। জীবনে মায়া-মমতা-প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে এসব সাইকোলজিক্যাল ব্যাপারকে খুব একটা গুরুত্ব দেইনি কোনোদিন। কেননা ‘হোয়াট ইজ সাইকোলজিক্যাল ইজ আলটিমেটলি বায়োলজিক্যাল’ এ সত্য আমি জানি। সুতরাং বায়োলজিক্যাল নিড ফুলফিল করে সোশ্যাল ওয়েবে আমি জড়াতে চাই না। তাই আমি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে একলা থাকার চেষ্টা করে আসছি। কিছুটা রুক্ষ-নীরস হয়তো হয়েছি। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।

 

ফটোগ্রাফে চৈতী তাকিয়ে আছে। যেন আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে। অনিশ্চিত জীবনের দিকে। অসীম সম্ভাবনার দিকে। আমার জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনাগত সত্ত্বার ভেতরে প্রবাহিত করতে – আমাকে উৎসাহিত করছে। যাতে করে – আমি না থাকলেও আমার প্রতিনিধি হিসেবে কেউ থাকে। কেউ বহন করে আমার রক্তস্রোত। কেউ তার শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তথ্যকেন্দ্রে সঞ্চিত রাখে আমার ইতিবৃত্ত।

 

চৈতীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমাকে যেন দুই পথের সামনে দাঁড় করিয়েছে। যেখানে আমি দু’রকম ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। একটা আমার এখনকার যাপিত জীবনের মত। যেখানে ‘ইন্ট্রিকেসি’ নেই। বাঁধা নেই। মায়া নেই। স্নেহ-বন্ধন নেই। সম্পৃক্ততা নেই। যেখানে নির্লিপ্ত থাকলে কেউ উদ্দীপ্ত হবার তাগাদা দেবে না। যেখানে শারীরিক-মানসিক শক্তি হারালে আমাকে কেউ ভরসা দেবে না। কাঁধে হাত রেখে বলবে না – আমি পাশে আছি। যেখানে আমার দার্শনিক যুক্তিপ্রিয় মন হয়তো সন্তুষ্ট হবে দুদ্দাড় এক বন্ধনহীন জীবন নিয়ে। অথচ একই সাথে আমাকে একলা থাকার ভার বহন করে যেতে হবে। আর অন্য পথটাতে– আমাকে একজন নারীর ভালোবাসায় কিংবা তার এ্যাডাপ্টেবিলিটির ক্ষমতায় আস্থা রেখে তাকে সঙ্গী করতে হবে। আর তারপর একের পর এক অনিশ্চিত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে। কখনো পা ফসকে পড়ে যেতে হবে নিচে। আবার দাঁড়াতে হবে। সামাজিক ওয়েবে আমাকেও রাখতে হবে উপযুক্ত ভূমিকা। নিজেকে বিসর্জন দিয়ে আমার সত্তা বহনকারী ক্ষুদে-মানবদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাদের আনন্দের মাঝে নিজের আনন্দ খুঁজে পেতে হবে। ফেসবুকে টুইটারে ছবি দিয়ে বলতে হবে – আমার ছোট্ট বাবা, আমার ছোট্ট মা। নাহলে সমাজবিধি লঙ্ঘন হবে। আমি পতিত হব।

 

আচ্ছা, মল্লিক কি বিয়ে করার আগে এতকিছু ভেবেছিল? নাকি ওর শরীর রিপ্রডাকশনের প্রয়োজনে ‘পারফেক্ট ম্যাচ’ পেয়ে গেছে ভেবে এতকিছু ভাববার অবকাশ পায়নি। সিস্টেমটাকে সোশ্যালি একসেপ্টেবল করার জন্যে বিয়ে করে বসল। নাকি এতকিছু ভেবে কিছু হয়। ঠিক যেমন আমার এখন আর কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করছে না। বরং চৈতীর ফটোগ্রাফ শুধু নয়; ওর সমগ্রতার উপর অধিকার দাবী করতে ইচ্ছে হচ্ছে। বলতে ইচ্ছে হচ্ছে – চৈতী, তোমার চোখ দুটো অতল সরোবর। যেখানে জলের দোলায় পদ্ম দোলে। আমি সে সরোবরে সাঁতার কাটতে চাই। কিংবা – চৈতী, তোমার কালো চুল যেন আষাঢ়ের কালো মেঘ। আমি সেই মেঘের আঘাতে আর্দ্র হতে চাই। অথবা অধিকারের সেই স্বৈরাচারী পঙক্তি  – তুমি শুধুই আমার।

 

 

*****

আমি নৌকার মাঝ বরাবর বসে আছি। চৈতী গলুইয়ের কাছে। আকাশটা পরিষ্কার। আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হচ্ছে বিপুল তারকারাজি। ফিনফিনে বাতাসে শান্ত জলাভূমিতে আমরা দুই জলপ্রেমী, নৌকার উপরে দুলছি ঈষৎ হাওয়ায়। রাত বাড়ছে। বাড়ছে তারকানিসৃত আলো। সেই শান্ত-সুশীতল আলোতে চৈতীকে লক্ষ্য করছি আমি। ও বসে আছে গলুইয়ে। দৃষ্টি সামনের জলের উপরে স্থির। এদিকে ওদিকে উড়ছে জোনাকপোকার দল। অনতিদূরে ডুবসাঁতার খেলছে কিছু মাছ। গভীর নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিচ্ছে তাদের লুটোপুটির আওয়াজ।

 

চৈতী ওর শরীরের রমণীয় বাঁক এলিয়ে খুব সাবধানে আমার পাশে এসে বসল। হাত রাখল আমার কাঁধে। আমি ওর দীঘল চোখের দিকে তাকালাম। ওর মেঘকালো চুল হাওয়ায় দুলছে। চৈতী আরো কাছে আসছে। একদম হৃদয়ের কাছাকাছি। ওর শরীরের ঘ্রাণ আমাকে মদির করে তুলছে। ওর স্পর্শ আমার ভেতরের সত্ত্বাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ওর নরম উষ্ণ ঠোঁট আমার ভেতরটাকে তোলপাড় করে দখল করে ফেলছে। আমাকে টানছে। উদ্বুদ্ধ করছে। চোরাস্রোতে পড়ে ভেসে যাচ্ছে আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আমি লুপ্ত হচ্ছি। মিশে যাচ্ছি অন্য কোথাও।  যদিও আকাশভর্তি নক্ষত্ররাজি তাদের নগ্ন সৌন্দর্য জলের উপর প্রতিফলিত করে – শতশত জোনাকিকে সংগে নিয়ে আলোকচ্ছটা জ্বালিয়ে – পরিবেশকে করে তুলেছে অতুলনীয়। তবু সবকিছু ছাপিয়ে আমি চৈতীর নগ্ন-স্নিগ্ধ বাহুর মধ্যে ধরা দিচ্ছি। ওকে নিরাভরণ করে নিজেকে মুক্ত করে দিচ্ছি আদিম ইচ্ছায়। ওর রহস্যময় ত্রিভুজ ছুঁয়ে লাভ করছি পরমসুখ। শরীরের বাঁকে বাঁকে তুলছি উত্তাল ঢেউ। আর এরই সাথে – চৈতীর কোমল-কমনীয় গহ্বরে নিজেকে ঢেলে দিয়ে – আমার সত্তাকে ভাগ করে দিচ্ছি অনাগত অসংখ্য ‘আমি’তে।

 

 

—–

Leave a Reply