শ্রীনগরের ভেজবাজার নেমে রিকশা নিয়েছি, রানা ভাই পাশে বসা। দেখলাম পাশ দিয়ে একটা লোক মাথাগরম করে কি যেন বকতে বকতে রিকশা করে যাচ্ছে। রানা ভাইকে বললাম, রানা ভাই, এই এলাকার লোকের মাথা তো দেখছি আমার থেকেও বেশি গরম থাকে।

 

‘শোনো, তোমার চেয়ে মাথা গরম লোক হওয়া সম্ভব না’ – হাসতে হাসতে রানা ভাইয়ের ঝটপট উত্তর।

 

আমি খুব একটা মাথাগরম লোক নই। তবে হ্যাঁ, খুব কাছের লোকেরাই শুধু জানে আমার মেজাজ-মর্জি, চিন্তা-ভাবনার কোনো সুনির্দিষ্ট গতিপথ নেই। আমার হিসেবের বাইরে কিছু গেলেই আমি কেটে পড়ি সেখান থেকে। কিংবা ছুড়ে ফেলে দিই যা কিছু ভালোবেসে আকড়ে ধরে ছিলাম বহুদিন। এই স্বভাব আমার, এই ভালো, তো এই ভয়াবহ।

 

রানা ভাই কিছু না বলে উচ্চস্বরে হাসেন। আমিও হাসি। হাসতে হাসতে পথের দুধারের সবুজে চোখ বোলাতে বোলাতে এগোই। রানা ভাই জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলেন, মামুন, ভালো করে বড় বড় শ্বাস নাও। আগামী এক সপ্তাহ এই দিয়েই তো চলতে হবে।

 

এটা আমাদের রুটিন হয়ে গেছে। ঢাকা শহর ছেড়ে আমরা প্রায়ই বের হয়ে যাই এদিক ওদিক আকাশ দেখতে, যেখানে আকাশ নীল। যেখানে বাতাসে কিছুটা সজীবতা এখনো অবশিষ্ট আছে।

 

শ্রীনগর থেকে রিকশা করে গাদিঘাট এলাম। এখান থেকেই নৌকা নিতে হয় বিলে ঘোরার জন্য। এদিকে দুপুর হয়ে গেছে, নামায পড়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর নৌকা নেব এমন প্ল্যান করলাম। কিন্তু গাদিঘাটে কোনো হোটেল খোলা নেই। কি আর করা, আবার ফিরে গেলাম শ্রীনগর। একটা মসজিদে জুম্মার নামায পড়লাম। তারপর ইসলামিয়া হোটেলে দুপুরের খাবার খেলাম। যদিও হোটেলে খাওয়ার ইচ্ছা আমার ছিলো না। পথে একটা বিয়েবাড়ি দেখে আমি রানা ভাইকে বললাম, ভাই চলেন, এই বিয়ে বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে আসি। কিন্তু রানা ভাই কিছুতেই রাজি হলেন না। বললেন, আরে নিজের গ্রাম হইলে যাওয়া যাইতো। এখানে যাওয়া ঠিক হবে না।

কি আর করা! হোটেলে লাঞ্চ শেষ করে রিকশা নিয়ে আবার ফিরে এলাম গাদিঘাটে ।

 

দরদাম করে উঠে পড়লাম খালেক চাচার নৌকায়। ঘন্টা তিনেক নৌকায় ঘুরব আমরা। খালেক চাচা মিশুক মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে তিনি উস্তে(করল্লা) চাষ করেন এই বিলে। অন্যসময়ে মাছ ধরে, নৌকা বেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

 

আমরা নৌকাভ্রমণ শুরু করলাম। ছোট্ট নৌকা আমাদের, একটু নড়াচড়া করলে পুরো নৌকা দুলে ওঠে।

 

উপরে নীল আকাশ, কিছু ছেড়া ছেড়া মেঘ ভেসে যাচ্ছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে কিছু ছবিও তুলে নিলাম। রানা ভাই কবিতা আবৃত্তি করলেন। আড়িয়াল বিলে আসলেই রানা ভাইয়ের কবিতা আর গান গাওয়ার বাতিক শুরু হয়। আমাকে বলতে থাকেন, মামুন, তাহলে এবার কি গান হবে, নাকি কবিতা?

 

আমি বলি, এখন কিছুই হবে না, চুপ করে প্রকৃতি দ্যাখেন। একটু পর কি করা যায় দেখতেছি।

 

তারপর একসময় রানা ভাইয়ের গলায় কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনোবা জীবনানন্দ দাশ ভর করে। আমি মুগ্ধ হয়ে স্মৃতিবন্দী করে রাখি সে মুহূর্ত। জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ একটা অন্যরকম আবহ তৈরি করে।

 

রানা ভাই শুয়ে আছেন

 

রোদে ঝকঝক করছে চারপাশ, এদিক ওদিক ফড়িং উড়ছে। দূরে পানকৌড়ির উড়াউড়ি, শালিকের কিচিরমিচির, শাপলার কুড়ি উঁকি দিচ্ছে পানির ভেতর থেকে, বাতাসে দুলছে কচুরিপানার দল, আর স্পিকারে মৃদুস্বরে রবীন্দ্রসঙ্গীত।

 

সবমিলিয়ে আড়িয়াল বিল বরাবরের মতোই অসাধারণ হয়ে ধরা দিল আমাদের কাছে। হয়তো শীঘ্রই আবারো যাবো, ঢাকার বিষাক্ত বাতাসে নিঃশেষ হয়ে যাবার আগেই।

 

আড়িয়াল বিল, যেখানে আকাশ নীল

 

নৌকায় শুয়ে আছি

 

নৌকা ও নৌকার মাঝি

 

Leave a Reply