বিগত দিন কেবলই সম্মুখে ঠেলে দিলে হাতে উঠে আসে বাজারের ব্যাগ,  দুপুর রোদের পিচঢালা পথে দীর্ঘশ্বাসের সাথে সেলাই হয় মানব ছায়া। ছায়ার ভেতর সেঁধিয়ে যাই আমি।  ‘কোথায় যাচ্ছেন?’ বলে প্রতিবেশি ডাক দিলে আমার উত্তরের খাতায় কেবলই শূন্যযোগ বাড়ে।

 

গৃহী জীবন আমার আরাধ্য ছিলো না কোনো কালেই। তবু জীবনটা এখন পাটিগণিতের উত্তর না মেলা জটিল ভগ্নাংশ; পড়া না পারা ফ্যালফ্যালে চোখে কাঁদো কাঁদো এক জোনাকি পোকা। কোথায় যাচ্ছি আমি? মুঠোবন্দী বাজারের ব্যাগে উত্তর মিললেও সন্তুষ্ট হতে পারি না কোনমতেই।

 

বাজারে যাচ্ছি রহমত সাহেব। আপনি?
আমিও যাচ্ছি ভাই। ছুটির দিন ভাবলাম একটু আরাম করব, তা কি আর হবার আছে! বেরসিক বউ হাতে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিল।
আর বলবেন না, ভাই। আমারও একই অবস্থা, ছুটির দিনেও শান্তি নেই।
হাহ! কি আর করা। চলুন যাই।

 

রহমত সাহেবকে সঙ্গী করে সামনের দিকে পা বাড়াই। ঝাঁঝাল ঢেকুর তুলে আমাদের পেছন থেকে তাড়া করে মধ্যাহ্ন। সূর্যের উত্তাপে পেশিশক্তিকে যান্ত্রিক রুপ দিয়ে আমরা যথাসময়ের কিছুটা আগে নিজেদের আবিষ্কার করি শামছুলের কসাইখানায়। দেখি লোহার শিকে ঝুলে আছে খাসির টকটকে রান। জিজ্ঞেস করি গরুর সিনার মাংস আছে কিনা। হ্যাঁ সূচক উত্তর শুনে আমাদের চোখে লোভের বৃষ্টি শেষে রংধনু ওঠে। পেটমোটা শামছুল কসাই ঠিকই টের পায়, চাপাতিতে ধার দিতে দিতে বলে, স্যার এইমাত্র জবাই দিছি, একদম টাটকা। পুরাটাই লয়া যান।

 

স্যার সম্বোধনে আমাদের লোমকূপে অহংকার খেলা করে। আমরা শামছুলের হাতের ধারালো চাপাতিটার দিকে তাকিয়ে থাকি। ওর গায়ে শাদা স্যাণ্ডো গেঞ্জিতে পশুর টাটকা রক্তের আলপনা দেখি।  তারপর আমি আর রহমত সাহেব চোখাচোখি করি। আমাদের বাজারশাস্ত্রে লেখা আছে ‘কসাইয়ের কথা বিশ্বাস করতে নেই’। তাই আমরা শামছুলের কথা অবিশ্বাস করি, বাকবিতণ্ডা করি, দরদাম করি। তারপর পকেটের উত্তাপে বরফকুচি ঢেলে ব্যাগভর্তি আমিষ নিয়ে বাড়ির দিকে চলতে চলতে বলি, মাংসটা একদম টাটকা, দেখেছেন?

 

কি জানি, শালাদের কথার কি কোনো ঠিক আছে। বাড়িতে গেলে গিন্নীই টের পাবে টাটকা না বাসী।
তারপর, আপনার মেয়েটা কেমন আছে? বয়স কতো হলো?
আছে ভাই ভালই। এই সামনের জুলাইয়ের ১২ তারিখে একবছর পূর্ণ হবে। আপনার ভাবী তো এখনই স্কুলে দেয়ার জন্য প্রতিদিন ঘ্যানর ঘ্যানর করে।
হা হা হা, তাই নাকি।

 

কথার রেলগাড়িতে চেপে বাড়ি ফিরতে আমাদের দেরি হয় না। ভদ্রতার হাসি নিক্ষেপ করে আমরা দুই প্রতিবেশি বিচ্ছিন্ন হই। দরজায় কেঁদে ওঠে কলিংবেল। ‘রিতা দরজা খোল’  বলে ব্যাগ হাতে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। ওপাশ থেকে আকাঙ্ক্ষিত নারী কণ্ঠ ভেসে আসে।

 

নাকের ডগায় শিশিরের মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম নিয়ে রিতা আমার হাত থেকে বাজারের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। বলে, এসো। আমি বাতাস ঠেলে ঢুকে পড়ি সাজানো সংসারে।

 

যা যা বলছিলাম সব আনছো তো ?
হ্যাঁ, সবই আছে। গরুর সিনার মাংস, কলিজা, রুই মাছ, গরম মসলা, কাঁচামরিচ, পিয়াজ সবই।

রিতার মুখে শরতের শিউলী ফোটে। তারপর কাটাকুটি শেষে ফ্রিজের ড্রয়ারে লাল রঙের মাংস সাজানো হলে ওর চোখে একঝাক প্রজাপতি নামে। মুখের হাসি অক্ষত থাকে। এবং সে রাতে ঘরের মধ্যে শারীরিক মিথষ্ক্রিয়া আরো প্রবল হয়। আমি আরো বেশি জড়িয়ে পড়ি সংসারে;  বলি, আহ কি মধুময় এই বেঁচে থাকা।  আমার ভাবনার সমর্থনে আমাদের আট মাস বয়সের ছোট্ট মেয়েটি দোলনায় কেঁদে ওঠে। আমি বলি, যাও আগে শান্ত করে এসো। রিতা কপট অভিমানে ফিডারের নিপল আমাদের ছোট্ট মেয়েটার মুখে সেঁধিয়ে দিলে তার কান্নার নদীতে ভাটা নামে। হাসিমুখে রিতা আবার আমার বুকে ফিরে আসে, আমি ওর মুখে চালান করে দেই একঝাক উষ্ণ নিঃশ্বাস।

 

একসময় রতিক্রিয়া সমাপ্তিতে ক্লান্ত হই। পাশে পড়ে থাকে নগ্ন রমণীর অসীম ক্ষুধাপাত্র। কামে-কর্তব্যে-অবসাদে  অতঃপর মশারির ফিতে বাঁধি।  বালিশের নরম পেটে ঢুকিয়ে দেই মস্তিষ্ক। হঠাৎ রহমত সাহেবের কথা মনে পড়ে যায়। বাজার শেষে ফেরার সময় কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন, গিন্নীর ভালবাসা বাজারের ব্যাগে ভরে তবেই বাড়ি ফিরতে হয়। তার কথার আমি কিছুই বুঝি নি। শুধু ‘বাজার’ রচনার  উপসংহারে লিখেছিলাম, রহমত সাহেবের স্ত্রী ভাগ্য মন্দ।

 

কি ভাবছ এতো?
কই কিছু না তো। রিতার প্রশ্নে ভাবনায় ছেদ পড়ে।
তাহলে ঘুমাচ্ছ না কেন, সকালে তো অফিস আছে। – বলে রিতা হাত রাখে আমার বুকে।
এইত এবার ঘুমাব।

 

অজান্তেই বুক থেকে ওর হাত সরিয়ে দিই।  আমার উদাসীনতায়  কামিনীর চোখ জুড়ে উথলে ওঠে টলমল পদ্মদিঘি। কনুইতে ভর দেয়া দুটো জ্বলজ্বলে চোখের জলতরঙ্গে অসন্তোষের বাতাস আছড়ে পড়ে। ঠোঁট দিয়ে জলটুকু শুষে নিলে টের পাই শরীর জুড়ে ঘুঘুর বুকের উষ্ণতা। রিতার সাথে চার পা এক করে শুয়ে থাকি সারারাত এবং পরদিন বিকেলে অফিস শেষে বাণিজ্যমেলার স্টলে স্টলে রেখে আসি কিছু  অব্যর্থ দীর্ঘশ্বাস।  ঘরের ভেতর আরো কিছুটা আধুনিক হাওয়া জমে যায়। অর্ধাঙ্গিনীর দাঁতে লেগে থাকে কৌতুক-প্রতিক্রিয়া। আমি তার চোখে খুজেঁ ফিরি সংসারজীবনের আনন্দ। ছোট্ট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে চুমু খাই, মেয়েটা অস্ফুটে আব্বু আব্বু করে ওঠে। আমি অসীম তৃপ্তিতে সুখের উৎস ভেবে রিতাকে জড়িয়ে ধরি।

 

প্রশ্ন করি,  কতদিন ভালোবাসবে?  অর্থাৎ একজনকে কতোদিন ভালোবাসা যায়?

 

উত্তরে শোনা যায়,  আগামীকাল পার্টি আছে সুচিন্ত’র বাড়িতে,  ডায়মন্ডওয়ার্ল্ড থেকে এখনো আসেনি হীরের লকেট। কিংবা জানা যায়,  লাল রঙের গাড়িটা,  যেটা দেখে এসেছিলাম সপ্তাখানিক আগে,  তার চেয়ে আপডেট একটা মডেল এসেছে গতকাল। রিতা বলে,  শোনো, গাড়িটা কিন্তু এ সপ্তাহেই কেনা চাই। নতুন গাড়ি নিয়ে মা-বাবা’র এনিভার্সারিতে গিয়ে ওদেরকে  দারুণ একটা সারপ্রাইজ দেব।  তখন বুঝবে আমরা কেমন সুখে আছি।

 

আমি একটা হাঁচি দিয়ে ভুল সময়ে গুরুতর প্রশ্ন নিক্ষেপের লজ্জা লুকোই। বলি, আচ্ছা সে দেখা যাবে।

 

তার পরদিন রিতার বন্ধু সুচিন্ত’র ফ্ল্যাটের ঝকমকে ফলস্ সিলিংয়ে সেটে রাখি কিছু মূল্যবান সামাজিক মুহূর্ত। ফেরার পথে ‘আপডেট মডেল’ হয়ে বাড়ি আসি।  নেগোসিয়েশান হয়ে যায়। রিতার চোখ দুটোতে সুখের ময়ূর পেখম মেলে নেচে ওঠে। ছোট্ট মেয়েটাও বোধহয় দূর্বোধ্য কোনো শব্দে তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। রিতা বলে, দ্যাখো দ্যাখো, সোনামণি কিভাবে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে?

 

এই যে আমার লক্ষী মামণি, নতুন গাড়িতে চড়বে তুমি?

 

উত্তর পাব না জেনেও আমি আমার ছোট্ট মেয়েটাকে অহেতুক প্রশ্ন করে আনন্দ পাই। ওর নরম গালে গাল ঘষি, মুখে ঠোঁট ছোঁয়াই। বাবার আদর পেয়ে মেয়ে আমার একহালি দাঁতে ফিক করে হেসে ওঠে। আমি সুখের সন্ধান পাই।  তবু কেন যেন আচমকা রহমত সাহেবের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি সেদিন বলেছিন, আমরা আসলে সন্তানদের ভালবাসি না। ভালবাসি নিজেদের। নিজেরা আনন্দ পাই বলেই সন্তানের গালে চুমু খাই। না হলে সন্তান বড়ো হলে কেন আর তাদের চুমু খাই না?

রহমত সাহেবের কথা ভুলে যাব ভেবে আমি আকাশের দিকে তাকাই। দৃষ্টি আঁটকে যায়। দেখি, আমার কপালজোড়া সংসারসুখের মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে আছে একজোড়া কবুতর। ইলেকট্রিক তারে বসে তারা ঘর বাঁধবে বলে অঙ্গীকার করে। আমি কল্পনায় জলপাই পাতা নেড়ে তাদের শুভেচ্ছা জানাই। বলি, সুখে থেকো।

 

পরদিন বিকেলে, পার্কে অতিভোজনে সঞ্চিত চর্বি বিসর্জন দিতে গেলে আবারো রহমত সাহেবের সাথে দেখা হয়ে যায়। কেন যেন মনে হয় এই লোকটি কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ে না। তবু দেখা হলে ভালোই লাগে।  ভদ্রতার হাসি বিনিময়ের পর আমরা অভদ্র আলোচনায় মেতে উঠি।

 

জানেন রহমত সাহেব, আপনার কথাগুলো মিলে যাচ্ছে। ব্যাগভর্তি বাজারে, বাণিজ্য মেলার স্টলে, আর নতুন মডেলের গাড়িতে বউয়ের ভালবাসা জমা থাকে। আর হ্যাঁ, আপনি সেদিন ঠিকই বলেছিলেন, আমরা আসলে নিজেদেরকেই সবথেকে বেশি ভালবাসি।

রহমত সাহেব আমার চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নেন। আমি বুঝে যাই, সত্যের উল্কাপিণ্ড মিথ্যে পৃথিবী ভেদ করে বহুদূর চলে গেছে। তিনি মুখে হাত দিয়ে একটু কেশে ওঠেন, তারপর কথায় কথায় জানতে পারি তার বেডরুম বেদখল হয়ে গেছে, সেখানে এখন পাওয়া যায় অচেনা ব্রান্ডের ধুম্রশলাকা। অথচ রহমত সাহেব কোনদিনও ধুমপান করেন নি।

 

আমি আঁতকে উঠি। আমার চোখের হাই রেজুলেশন পর্দায় রিতার মুখ ভেসে ওঠে। পাশাপাশি দেখতে পাই ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুচিন্ত দাঁত কেলিয়ে হাসছে। এক দৌড়ে এক্ষুনি বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করলে নিজেকে আমার ভীষণ ‘ন্যারো মাইন্ডেড’ মনে হয়। তাই সন্দেহের নৌকা জলে ডুবিয়ে রহমত সাহেবের পাশে হাঁটি।  নীরবে অনেক কথা চালাচালি হয়।

 

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখি মা-মেয়ে জলসা বসিয়েছে। হঠাৎ রিতার উপর পরীক্ষা চালানোর নেশা আমাকে পেয়ে বসে। আমি গম্ভীর স্বরে ডাকি, রিতা একবার এদিকে এসো তো।

 

কি, বলো।
এক গ্লাস পানি দাও।
কি ব্যাপার, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন।
চেহারায় মিথ্যে বলার মতো সত্যিকার বিষণ্ণতা ফুটিয়ে বলি, এমডি ফোন দিয়ে বলল এক্ষুনি অফিসে যেতে। কি যেন একটা বড়ো ধরণের ঝামেলা হয়েছে।
অফিসে আবার কি হলো। যাও এক্ষুনি যাও, আর হ্যাঁ, বেশি রাত করো না কিন্তু।

 

আমি পথে নামি। আমার কাঁধে চাপে উদাসীনতার বিলাসী ভূত। ফুটপাত ধরে হেঁটে চলি আর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করি। মধ্যবিত্ত দর্শন মাথার ভিতরে ডুবসাঁতার দেয়। আমি পাত্তা দেই না। কোথাও কোনো বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, ‘ পলিটিক্সের মতো মানুষের জীবনও হচ্ছে এডজাস্টমেন্ট আর কম্পমাইজ। এ দারুণ ইনফ্লেশনের বাজারেও সংসারে শুধু হৃদয়ের দাম খুব বেশী নয়।’ কথাটা আমি দাড়িপাল্লায় ওজোন করে যাচাই করতে চাই। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না। ফুটপাতের ভাঙ্গা ইটের উপর গাছের শুকনো পাতা নিঃশব্দে শুয়ে থাকে, আমি ভিড় ঠেলে হেঁটে চলি। রিতার আসন্ন পরীক্ষার সব প্রশ্নপত্র তৈরি হয়ে যায়। দাবার চৌষট্টি ঘরে একক মন্ত্রী খেলা করে।

 

এদিক ওদিক ঘুরে হাতের মুঠোয় একটি মধ্যবয়সী রাত নিয়ে বাড়ি ফিরি। কলিংবেলে বুড়ো আঙুলের ছাপ রাখি। ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন নারীকণ্ঠ শোনা যায়।

 

কি হলো, খারাপ কিছু? এতো দেরি করলে যে?
জবাবে কিছু না বলে সামনে এগোই। ওয়াশরুমের লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে নিজেকে মাস্টারমশাই মনে হয়। চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে আসি। বলি, চাকরিটা চলে গেল রিতা।
কেন? কি হয়েছে? তুমি কী করেছ?
একটা বড়ো ঝামেলা হয়ে গেছে অফিসে।

 

আমি একজন সৎ কর্মচারী ও দূর্নীতিবাজ বসের বিশ্বাসযোগ্য গল্প ফাঁদি। গল্পের ফাঁদে আটকা পড়ে বউ আমার কেঁদে ওঠে। আমার জন্য নয়, চাকরিটার জন্য। বলে, তাহলে গাড়িটা কেনার কী হবে, আগামী সপ্তাহে বাবা-মা’র এনিভার্সারি। ভেবেছিলাম…

 

রিতার গলা ধরে আসে। ফুঁপিয়ে ওঠে। আমি বলি, সব ঠিক হয়ে যাবে। নতুন চাকরি খুঁজব। রিতা বুদ্ধিমতী বলেই চাকরির বাজারের হালচাল বোঝে, তাই ওর বন্ধু সুচিন্ত’র সাথে কথা বলার প্রস্তাব দেয়। ভেবে দেখব – বলে সেদিনের মতো ঘরোয়া চিত্রনাট্যের পর্দা টানি।

 

রাতে রিতার উষ্ণ শরীর ছুঁয়ে দিতে গেলে ও পাশ ফিরে শুয়ে থাকে। সাড়া দেয় না। আমার ভ্রু কুঁচকে যায় এবং তখন আবারো কেন যেন রহমত সাহেবের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি সেদিন বিকেলে পার্কে হাঁটতে হাঁটতে বলেছিলেন, বুঝলেন, মানিব্যাগে জোর না থাকলে আপনার পুরুষত্বের কোনো দাম নেই। বিশ্বাস না হয় পরীক্ষা করে দেখুন।

 

দিন যায়। আমি ইচ্ছে করে অকর্মণ্য হতে থাকি। সংসার নিয়ে পরীক্ষা পরীক্ষা খেলার নেশায় মেতে উঠি। ঘর থেকে আধুনিক হাওয়া ঝেটিয়ে বিদায় করে দেই। সেই সাথে আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর হাসিতে কালো কালির মলিন দাগ জেগে ওঠে। আমি আশ্বাস দেই, আবার সব হবে।

 

কেমন পুরুষ মানুষ তুমি? একটা চাকরি গেছে আর অমনি হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে আছো? – রিতা খেঁকিয়ে ওঠে।
তো কি করব?
কি করবে মানে? চাকরী খুঁজবে। মেয়েটা বড়ো হচ্ছে সে খেয়াল আছে, ওর ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে না?
আরো কিছুদিন এমন থাকি না! বেশ তো চলছে। তারপর না হয় আমরা কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে একটু নিরিবিলি থাকলাম। অনেক তো হলো শহরে…
কী? কি বললে তুমি? গ্রামের বাড়িতে… আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড? নিষ্কর্মা পুরুষের মতো ঘরে বসে থাকবে, আর বলবে, বেশ তো চলছে,  রিডিকুলাস!

 

রিতার মুখে সিংহ গর্জন করে ওঠে। আমি ভয়ে কুঁকড়ে যাই। গুটি কেটে বাইরের আকাশে প্রজাপতি হয়ে বের হই। পরীক্ষা চালাতে গিয়ে এতো তাড়াতাড়ি ভাংচুর ঘটবার সম্ভাবনা তৈরি হবে কেইবা জানত। রিতার কণ্ঠস্বরে আমি পদ্মার ভাঙ্গনের আওয়াজ শুনতে পাই। এমডিকে ফোন করে ছুটি সংক্ষেপ করি। দরকার নেই আমার পরীক্ষা-টরিক্ষার। বলি, স্যার কাল থেকে আবার জয়েন করি, ছুটি আর ভালো লাগছে না।

 

একা একা পথ হাঁটি। আজ থেকে আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। রিতাকে বলব, চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি রিতা শুনছো। ওর মুখে জোনাক পোকার বান ডাকবে। শরীর জুড়ে আসবে উত্তাল ঢেউ। তবু এখন জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে আমার কান্না পাচ্ছে। শুধু কাঁদছি না অনর্থক হবে ভেবে। শৈশবে ফেলে আসা নিষ্কাম নিরপরাধ স্মৃতিগুলো উঁকিঝুকি দিচ্ছে, মেঘের আড়ালে লুকানো সূর্যের মত। সেখানে রিতা নেই, আমার ছোট্ট সোনামণি মেয়েটা নেই, চাকরী নেই, সুচিন্ত’র ফ্ল্যাট নেই, সন্দেহ নেই, নেই শ্বশুর-শাশুড়ির এনিভার্সারি; আছে কেবল বকুল তলায় একটি শিশুর ছোট ছোট পায়ের ছাপ, ঝড়ের দিনে আমবাগানে গোল্লা-ছুট, ঘুড়ির সুতোয় খুশির ঝিলিক। অথবা মধ্যদুপুরের নিশ্চল হাওয়ায় দম ধরে থাকা মেহগনির পাতা, ফল ফেঁটে  ঘুরতে থাকা  হেলিকপ্টার। আমি চোখ বন্ধ করে সব পেরিয়ে তবুও ধরতে পারি না শৈশব। গাঙ-শালিকের পাখায় কেবলই লেখা হয়ে যায় আমার ব্যর্থতার ইতিহাস। এলোমেলো ভাবনায় করোটিতে একদল শুয়োপোকা  হাঁটে। প্রজাপতি শুধু  অন্যকোনো বাগানে সচল রাখে পরাগায়ন।

 

মধ্যবিত্ত অচল দর্শন গলা টিপে খুন করে আমি বেশ রাত করে বাসায় ফিরি। কলিংবেলে রাখি ডানহাতের তর্জনী। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো মায়াময় নারীকণ্ঠ ভেসে আসে না। দরজা খুলে যায়। আমি সগর্বে রিতার ম্লান মুখে চাকরি পুনঃপ্রাপ্তির খবর টানিয়ে দেই। রিতার চোখ দুটো হেসে ওঠে। আমার ছোট্ট মেয়েটা অস্ফুটে বা বা বা করে কি যেন বলতে চায়, আমি না বুঝেই হেসে ফেলি। মনে মনে বলি, নিকুচি করেছে জীবন নিয়ে পরীক্ষার, এইত বেশ আছি।

 

ফ্রিজ থেকে লাল টকটকে মাংস বের হয়। রান্নাঘরে জমে যায় সুগন্ধী আকাশ। আবার আগের মতো রিতাকে বিছানায় পাই। দু’হাতের মাঝখানে দুলে ওঠে রিতার কামনা। কামে-কর্তব্যে-অবসাদে  অতঃপর মশারির ফিতে বাঁধি।  বালিশের নরম পেটে ঢুকিয়ে দেই মস্তিষ্ক। আচমকা বালিশের পাশ থেকে হাতে উঠে আসে সিগেরেটের অব্যবহৃত অংশ। কিন্তু আমিও তো রহমত সাহেবের মতো ধূমপান করি না।

 

সংসার নিয়ে পরীক্ষা পরীক্ষা খেলার ফলাফল আমি হাতে নাতে পেয়ে যাই এবং রহমত সাহেবের উপর ভীষণ রাগ হয়। ব্যাটাকে এবার সামনে পেলে একচোট দেখে নেব, এই ভেবে চোখ বন্ধ করে মিথ্যে ঘুমের ভেতর সত্য লুকাই। অভিনয় করি। আমার বুকের ওপর রিতা ওর ডানহাত ফেলে রাখে। মনে তীব্র ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও আমি আপত্তি করি না।

 

পরদিন অফিস শেষে আমার পরম হিতৈষী, প্রতিবেশী রহমত সাহেবের দরজায় এই প্রথমবারের মতো কড়া নাড়ি। সেখানে একটা নারীমুখ উঁকি দিলে আমি রহমত সাহেবের কথা জানতে চাই এবং জবাবে শুনি, এই নামে এ বাড়িতে কেউ কোনোদিনও ছিলো না।

 

Leave a Reply