বৃহস্পতিবার প্ল্যান করে শুক্রবার ঘুরে আসাটা মোটামুটি একটা রুটিনে দাঁড়িয়ে গেছে।

 

আমরা এমনই ছন্নছাড়া। আমরা মানে আমি, রানা ভাই, জুয়েল ভাই, মাহবুব ভাই, কখনো কখনো বজলু ভাইও যোগ দেন এই দলে। এই দলের আরেক মহারথী রাজু ভাই, যার সাথে আমার আলাপ হলো এই নিকলী হাওড়ে ঘুরতে যেয়ে। এছাড়া এবারের ট্যুরে আমাদের সাথে প্রথমবারের মতো যোগ দিলেন মারিয়া আপা এবং উনার হাজব্যান্ড মুনির ভাই।

 

অফিসে বসে কাজ করছি হঠাৎ রানা ভাইয়ের ফোন। বললেন, চলো কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড় থেকে ঘুরে আসি।
আমি বললাম, আর কে যাবে?
রানা ভাই বললেন, গ্রুপের সবাইকে জানাই, কেউ না গেলে তুমি আর আমি।
আমি বললাম, ওকে ডান।

 

ব্যাস হয়ে গেল ট্যুর প্ল্যান। রানা ভাই আর আমার এই ব্যাপারে খুব মেলে যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের ঠোকাঠুকি। রানা ভাই বলেন, তুমি বড় ভাইদের শ্রদ্ধা করতে জানো না। আমি বলি, আমি এরকমই । পোষাইলে মেশেন, না পোষাইলে ভাগেন।

রানা ভাই প্রবল আপত্তি করে বলেন, এইসব ডায়ালগ তুমি তোমার গার্লফ্রেন্ডদের দাও, আমাদেরকে না।

আমি বলি, শোনেন, গাড়ির দরজার পাশেই তো বসছেন। না পোষাইলে, জাস্ট দরজা খুলে নেমে যান। আমি কাউকে বয়স কিংবা ডেজিগনেশান দিয়ে মাপি না।

 

রানা ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ভাই-বন্ধু ছাপিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে।

 

যাহোক, বৃহস্পতিবার রাতে অফিস শেষে রানা ভাইয়ের বাসায় ইলিশ খাওয়ার দাওয়াত। মাহবুব ভাই, বজলু ভাই, জুয়েল ভাইও হাজির। পাঁচজনে মিলে খাওয়াদাওয়া করে চুটিয়ে আড্ডা দিলাম।

 

মাহবুব ভাই জানালেন তিনি নিকলী যেতে পারবেন না, কারণ কাল শুক্রবার নামায আছে। মাহবুব ভাই প্রত্যেক শুক্রবারে নামাযের দোহাই দিয়ে কোথাও যান না। অন্য দিন নামাযের খবর নাই অথচ শুক্রবারে তার বাসার পাশের মসজিদে নামায পড়া চাইই চাই। এটার রহস্য আমরা আজো ভেদ করতে পারি নাই। তদন্ত চলছে, দেখা যাক।

 

এদিকে বজলু ভাইয়েরও শরীর কিছুটা খারাপ থাকায় সিদ্ধান্ত হলো আমি, রানা ভাই, জুয়েল ভাই, রাজু ভাই, মারিয়া আপা ও তার হাজব্যান্ড এই মোট ছয়জন নিকলী হাওড়ে যাব। মারিয়া আপা আমাদের জন্য সকালে গাড়ি পাঠাবেন।

 

শুক্রবার ভোরে ৬ টার দিকে গাড়ি এলো। কোথাও যেতে গেলে রানা ভাই মাথা খারাপ করে দেয়। এত অস্থিরচিত্ত লোক আমি আর দেখি নাই। ভোর পাঁচটা থেকে রানা ভাইয়ের চ্যাঁচামেচিতে ঘুমের বারোটা বেজে গেছে। বাধ্য হয়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। কিছুক্ষণ পর রাজু ভাই আর জুয়েল ভাই আসলে আমরা প্রায় ৭ টার দিকে রওনা দিলাম। ওদিকে আরেকটা প্রাইভেট কারে মারিয়া আপা মুনির ভাইকে নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিলেন তিনশ ফিট থেকে।

 

তারপর যেতে যেতে হাসি-আড্ডা-গান-খুনসুটি। রাজু ভাইয়ের সাথে আমার দারুণ সিঙ্ক হয়ে গেল। আমি আর রাজুভাই মিলে রানা ভাই আর জুয়েল ভাইকে তুলোধুনা করলাম। ফোনে মাহবুব ভাইও যোগ দিলেন একসময়। রানা ভাইয়ের এখনো বিয়ে না করা কিংবা ব্যাংকার হয়েও জুয়েল ভাইয়ের অতিরিক্ত সাহিত্যপ্রীতিকে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে করতে এগিয়ে চললাম নিকলী হাওড়ের দিকে।

 

নিকলী পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর বারোটা। দেখলাম নিকলী বেড়িবাঁধ জুড়ে অনেক বাইকার এসেছে হাওড় দেখতে। আমরা একটা নৌকা ভাড়া নিলাম ঘন্টা চুক্তিতে। তারপর ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে হাওড়ের ভেতরের একটা দ্বীপের মতো গ্রামের দিকে চললাম।

 

নিকলী হাওড় আমার কল্পনায় যেমন ছিল তার চেয়ে বিস্তৃত। চারিদিকে আদিগন্ত জলরাশি আর আকাশভর্তি মেঘের ভেলা মন ভালো করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। একটা সমুদ্র সমুদ্র ফ্লেভার আছে এই হাওড়ে। কিছু কিছু জায়গা যেন অতলস্পর্শী। বড় বড় ঢেউয়ের নাগরদোলায় নৌকা দুলে ওঠে প্রায়শই। নৌকার মাথায় বসে পানিতে পা ডুবিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি অনন্য।

 

হাওড়ে এসে হাওড়ের পানিতে গোসল না করা অপরাধ। তাই আমি আর রানা ভাই অতিউৎসাহে নেমে গেলাম পানিতে। সাথে মুনির ভাইও।

 

আমরা বেশ অনেকক্ষণ পানিতে ডোবাডুবি করলাম। হাওড়ের কিছু বিচ্ছু বাহিনীর সাথে ফটোসেশন করলাম। মারিয়া আপার কিছু আন্তর্জাতিক মানের ছবি তুলে দিলাম। তার সাথে আলাপ হলো গল্প নিয়ে।

আমি ও মারিয়া আপা

 

তারপর ফিরতে ফিরতে দেখা গেল মেঘের ভেতর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে আশ্চর্য কোনো জ্যোতি কিংবা স্রোতের গা ঘেঁসে দ্রুতগতিতে অজানায় হারিয়ে যাওয়া কোনো পানকৌড়ি। আকাশভর্তি নীলের ভেতর খন্ড খন্ড সাদা মেঘের ভেলা আর তার নিচে শহুরে কিছু মানুষের শহর থেকে দূরে জলমগ্ন বাতাসে ভেসে বেড়ানোর সময়টুকু আসলে কতটা অর্থবহ? হারিয়ে যাওয়ার অনিবার্যতা মাথায় নিয়ে কেন এতো আয়োজন?

 

যাহোক, প্রায় তিনঘন্টা মতো জলমগ্ন থেকে আবার আমরা ফিরলাম কোলাহলে।

 

গাড়িতে উঠেই রানা ভাই বললেন, গানটা দাও। আমি চোখ গাড়ির জানালার বাইরে রেখে স্পিকারে রবীন্দ্রনাথকে ডাকলাম। তিনি জয়তীর কণ্ঠে ভূতলে নেমে এসে গাইলেন –

 

পাখি আমার নীড়ের পাখি
অধীর হলো কেন জানি …

আকাশ কোণে যায় শোনা কি
ভোরের আলোর কানাকানি …

পা খি আ মা র নী ড়ে র পা খি…

 

 

নিকলী যাওয়ার পথে আকশজুড়ে আলো

 

নিকলী হাওড়, কিশোরগঞ্জ

 

আমি ও জুয়েল ভাই

 

অথৈ পানিতে আমাদের নৌকা

 

একটা দ্বীপের মতো গ্রাম ও সারি সারি কোমর ভেজানো গাছ

 

মারিয়া আপা ও আমি

 

নিকলী হাওড়ের বিচ্ছু বাহিনী

 

নিকলী হাওড় ও ট্রলার

 

নিকলী হাওড়ের ওপর আকাশভর্তি মেঘ ও নীলের খেলা

 

এই আকাশে, আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

 

যেভাবে যাবেন

 

ঢাকার থেকে ট্রেন বা বাসে করে প্রথমে কিশোরগঞ্জ শহর। তারপর সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে নিকলী। এছাড়া ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে কিশোরগঞ্জগামী বাসে উঠে কালিয়াচাপরা সুগার মিল নেমে সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে নিকলী হাওড়।

 

যেতে সময় লাগবে সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা।

 

নিকলী হাওড় ভ্রমণের উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। এছাড়া শীতকালেও বিস্তীর্ণ হাওড়ে আদিগন্ত সবুজ দেখতে যেতে পারেন।

Leave a Reply