সেদিন ঈদগাহে যারা উপস্থিত ছিলো তারা কেউ কি জানতো, আজ যাকে তারা গান গাওয়ার অপরাধে ঈদগাহ থেকে বের করে দিতে চাইছে তাকেই আজ থেকে ষাট বছর পর এখানে নিয়ে আসতে হবে। এই ঈদগাহেই তাকে শেষবারের মতো দেখতে আসবে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত অনুরাগী।

 

আজ বিকেলে মৌমিকে বললাম, তোমাকে পড়ানো শেষ করে আমি মঞ্চনাটক দেখতে যাব। যদিও এই টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে আমার যেতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু নাটক দেখতে না গিয়ে যদি বাসায় যাই, তাহলে সন্ধ্যাটা নষ্ট হবে। কারণ বাসায় গিয়ে আসলে শুয়ে বসে থাকা ছাড়া কোনো কাজ হবে না।

 

মৌমি আমার কথা শুনে বলল, হ্যাঁ স্যার, এটা ঠিক বলেছেন। আমিও যখন কোনো কাজ থাকে না, তখন পেইন্টিং করি। কারণ অযথা সময় নষ্ট করার চেয়ে কিছু একটা করা তো ভালো তাইনা।

 

নিকেতন থেকে যখন বের হয়েছি তখন বৃষ্টি নেই, পথঘাট ভিজিয়ে দিয়ে সে চলে গেছে। আমি একটা বাসে করে কাকরাইল নেমে গেলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে শিল্পকলা একাডেমি।

 

সন্ধ্যার ভেজা হাওয়ায় হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হলো এই কাকরাইল, মালিবাগ, মৌচাক, বেইলি রোড এইখানে অল্প কিছুদিনে বেশকিছু সুন্দর স্মৃতি জমা হয়েছে আমার। রিকশায় করে ইতিউতি ঘুরে বেড়ানো, অনবরত মিষ্টি বকবক শোনা, যেতে যেতে হুট করে কোনো একটা রেস্টুরেন্টে নেমে পড়া, খাইদাই, ঘোরাঘুরি, তারপর রাতটাকে গভীরে নামিয়ে বাড়ি ফেরা। তো সেসব ক্ষণস্থায়ী সুন্দর স্মৃতিগুলোকে একবার মনে করে পরক্ষণেই আবার ‘ধুর ছাই’ বলে উড়িয়ে দিয়ে আমি টিকেট কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম।

 

ভদ্রমহিলা আমার হাতে পাঁচশ টাকার নোট দেখে সাথে সাথেই বললেন ভাংতি হবে না। অনুরোধেও কাজ হলো না বলে অগত্যা নানান দোকান ঘুরে ছোটভাইয়ের জন্য চকলেট কেনার ছলে টাকা ভাংতি করে তবেই টিকেট পেলাম।

 

‘মহাজনের নাও’ নাটকটি সুবচন নাট্য সংসদের ৩৩তম প্রযোজনা। আজ হয়ে গেলো এর ১২৫ তম মঞ্চায়ন। নাটকটি লিখেছেন শাকুর মজিদ আর নির্দেশনা দিয়েছেন সুদীপ চক্রবর্তী।

 

নাটক শুরুর আগে শাকুর মজিদ শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্ম নিয়ে কিছু কথা বললেন অপেক্ষমান দর্শকদের।

 

তারপর সন্ধ্যা ৭টায় হলের গেট খোলা হলো। এর আগেও আমি এই হলে দু’একটি মঞ্চনাটকের শো দেখেছি। আজ খেয়াল করলাম হলটার সাজসজ্জায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। অনেকটা যাত্রার ঢঙে সাজানো মঞ্চ। স্টেডিয়ামের মতো চারদিকে বসেছে দর্শক আর মাঝের অংশটা হলো মঞ্চ।

আবদুল করিম ও তার স্ত্রী

 

‘মহাজনের নাও’ প্রয়াত বাউল শাহ আবদুল করিম – এর জীবন ও দর্শন নির্ভর নাটক।

 

নাটক শুরু হওয়ার সময় বুঝতে পারছিলাম যে নাটকটি আমার ভালো লাগবে, যেহেতু জীবনীনির্ভর নাটকের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। কিন্তু এতটা ভালো হবে তা কল্পনাতীত ছিল। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছিলাম সারাটা সময় ধরে, যেন কোনো যাদুকর তার যাদুতে বশ করে রেখেছিল হলভর্তি মানুষকে।

 

শুক্রবার বলেই সম্ভবত বেশ ভীড়। এত মানুষ নাটক দেখতে এসেছে ভেবেই মনটা ভালো হয়ে গেল আমার। মুঠোফোনে আসক্ত বাঙালিকে মননশীল কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা কিংবা তাতে আনন্দ পাইয়ে দেয়াটা ভীষণ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো কিছু একটা ‘ট্রেন্ড’ হিসেবে না দাঁড়ালে কেউ সেটাতে আগ্রহ পায় না এখন।

গানের লড়াই

 

যাহোক, নাটক শুরু হলো।

 

একদল বাউল ঘুরে ঘুরে গান গাইছে। শাহ আবদুল করিমের গান। ভাটি অঞ্চলের গান। বাউল ও দেহতত্বের গান, যে গানে নিজেকে ও সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজা হয়।

 

গান শেষে সংলাপে ঢুকতেই বোঝা গেল নাটকের সংলাপ ছন্দে ছন্দে রচিত।  এমন কাব্যধর্মী নাটকে দর্শক ধরে রাখাটা খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে বলেই আমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। আমি দ্বিগুণ মনোযোগের সাথে দেখতে থাকলাম।

 

আবদুল করিমের জন্ম থেকে শুরু করে তার বেড়ে ওঠা, গরুর রাখাল হিসেবে চাকরি করা, গান গাওয়ার শুরু, মসজিদের ঈমামের বিরোধিতা, একসময় গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া, গান আর গানের লড়াই, অভিমান, দুঃখ-দারিদ্র্য, আর জীবন সংগ্রামের কাহিনী একের পর এক গান ও সংলাপের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে অডিটোরিয়ামের চারিদিকে। বাতাসে ভাসছে অনবদ্য একঝাক কুশলী অভিনয় শিল্পীর কণ্ঠ, তাদের দরাজ গলায় আবদুল করিম আমাদের হৃদয়ে ঢুকে যাচ্ছেন।

 

ঈদের দিন আব্দুল করিম নামায পড়তে আসলে তার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায় গ্রামের মানুষ ও ঈমাম সাহেব। এ জায়গায় ঈমামের চরিত্রের অভিনয় অতুলনীয় হয়েছে। করিম নিজের যুক্তি দিয়ে সবাইকে বোঝান তারও অধিকার আছে ঈদগাহে আসার। তাকে তখন সকলে গান ছেড়ে দিতে বললে উত্তরে তিনি বলেন –

 

গান গাই আমার মনরে বুঝাই
মন থাকে পাগলপারা
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া

গানে বন্ধুরে ডাকি গানে প্রেমের ছবি আঁকি
পাব বলে আশা রাখি না পাইলে যাব মারা
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া

গানের আসর

 

বাউল সম্প্রদয়ের যে অংশ গান রচনা করে দেহতত্ত্ব নিয়ে, যারা নিজেকে জানার মাধ্যমে বুঝে নিতে চায় সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির রহস্য, আবদুল করিম হয়ে ওঠেন তাদেরই একজন। এই আত্মজিজ্ঞাসার পথে আবদুল করিমের জীবনে আসে তার সহধর্মিনী আফতাব, যাকে উৎসর্গ করে করিম রচনা করেছেন আফতাব সঙ্গীত। একসময় স্ত্রী আফতাবের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন করিম।

 

অতঃপর দেখা পান সরলার। সরলা ছিলেন তার সাধনার সঙ্গী। তাকে আজীবন ভালোবেসে গেছেন আবদুল করিম। সরলার ভালোবাসা আর কালনীর ঢেউ তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে গেছে আত্মজিজ্ঞাসার পথে অনন্য সব পঙতি। একই সাথে তিনি গান লিখেছেন বঞ্ছিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যেও। তার গানে দরিদ্র্য মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েছে সরব, উচ্চকিত।

 

করিম ধীরে ধীরে লাভ করেছেন খ্যাতি, যদিও অভাব পিছু ছাড়েনি কখনো। দূর-দূরান্ত থেকে তার কাছে বাউলেরা আসতেন গান শিখতে, তার সঙ্গ পেতে। তিনি সস্নেহে সকলকে শেখাতেন।

 

সুবচন নাট্য সংসদের শিল্পীরা এসব ঘটনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন অনন্যসাধারণ অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে।

 

আবদুল করিম যে মহাজনের খোঁজে কাটিয়েছেন সমগ্র জীবন, সে মহাজনের সন্ধান কি তিনি পেয়েছেন জীবন সায়াহ্নে এসে? কেউ কি পায়, নাকি খুঁজে বেড়ানোই সার? – নাটকটি দেখতে দেখতে অনিবার্যভাবেই এই প্রশ্ন দ্বারা তাড়িত হই আমরা। আত্মজিজ্ঞাসার দর্পনে দেখি নতুন কারো ছায়া। নিজেকে জানার এক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় ভেতরে।

 

সূদুর সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের একজন হতদরিদ্র মানুষ কি বোধে তাড়িত হয়ে লিখছেন এমন আশ্চর্যসুন্দর গভীর সব গান? কালনি নদীর ঢেউয়ে ভেসে ভেসে কোন জীবনবোধে আক্রান্ত হয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শাহ আবদুল করিম, কে জানে !

 

‘মহাজনের নাও’ নাটকটি শাহ আব্দুল করিমের জীবন ও দর্শনের স্বরূপ ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে বাউলগানের মনমাতানো সুরে। নাটকটি দেখলে করিম সম্পর্কে কিছু না জানা মানুষেরও একটা সম্যক ধারণা হবে শাহ আবদুল করিম ও তার সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে।

 

মঞ্চসজ্জা, লাইটের ব্যবহার, সাউন্ড, কস্টিউম ও প্রপস যথাযথ ছিলো। কোনো নাটকের ১২৫তম প্রদর্শনীতে এগুলোর ত্রুটি থাকার কথাও না আসলে। আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি যে প্রত্যেকেই শাহ আবদুল করিমের চরিত্রে অভিনয় করেছেন একেকটা সময় এবং সবাই ভীষণ ভালো গেয়েছেন। এটা সচরাচর দেখা যায় না।

 

এখন নাটকের এই সুন্দর স্মৃতিটাকে অক্ষরবন্দী করতে করতে ভাবছি, টিপটিপ বৃষ্টি আর মনের ভেতরে থাকা খানিকটা অনিচ্ছা এড়িয়ে শিল্পকলায় না গেলে এত চমৎকার নাটকটা আজ দেখা হতো না।

 

 

শো শুরুর আগে নাট্যকার শাকুর মজিদ কথা বলছেন

 

নাটকের শেষ দৃশ্য

 

 

নাটক শেষে মামুনুর রশিদ এর বক্তব্য

 

মঞ্চনাটক ‘মহাজনের নাও’

 

Leave a Reply