বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছি, এমন সময় জাহিদের ফোন। ফোনটা হাতে নিতে নিতে ভাবলাম, শালার উদ্দেশ্যটা কি? কোনো দরকার ছাড়া তো ফোন দেয়ার কথা না?

 

জাহিদ বলল, তোর সাথে এক কাপ চা খাব, ইসিবি চত্তর আসতে পারবি?

আমি বললাম, তুই এত ভালো লোক হইলি কবে, আসল কথা বল, কি দরকার?

জাহিদের একই কথা। কোনো দরকার নাই। এমনিতেই।

আমি বললাম, ওয়ার্কশপ থেকে ইসিবি চত্তর আসবি শুধু আমার সাথে এককাপ চা খাওয়ার জন্য, এরকম বান্দা তো তুই না। এনিওয়ে, চলে আয়, সিএমএইচের কাছে এসে আমাকে ফোন দিস, আমি বাসা থেকে তখন বের হবো।

 

বন্ধুদের কেউ অকারণে ফোন দিলে ভালো লাগে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো প্রয়োজন ছাড়া বন্ধুরা এখন আর ফোন দেয় না।

 

কেউ ফোন দিয়ে যখন এটাসেটা বলে ভূমিকা পর্ব সারে, তখন আমি অপেক্ষা করে থাকি যে কখন তার আসল প্রয়োজনের কথাটা বলবে। আমার অনুমান ভুল হলে আমি আনন্দ পাই। কিন্তু বেশিরভাগক্ষেত্রেই অনুমান মিলে যায়, আর আমার বিরক্ত লাগে এইসব প্রয়োজন-সাপেক্ষ বন্ধুত্ব দেখে।

 

যাহোক, বুদ্ধিজীবী জাহিদ ইসিবি চত্তর এলে আমরা ‘বাইট স্টেশন’ নামক একটা রেস্টুরেন্টে বসি। তারপর আলুভাজা (ফ্রেঞ্চফ্রাই) আর কোল্ড কফি ওর্ডার দিয়ে নানান গল্প শুরু করি।

 

জাহিদ বিবাহিত, প্রায় বছর দুয়েক হয়েছে সে লেজ কেটেছে। আমি তার ঘরের খবর জিজ্ঞেস করি। তার অতিপ্রতিভাবান ভাই দুটোর খোঁজ নিই। সে আমার বাসায় কে কেমন আছে জানতে চায়। এইসব কুশলাদি বিনিময়ের ফাঁকে আমাদের আরেক বন্ধুর কথা ওঠে যে কিনা কয়েকদিন আগে বিয়ে করেছে, অথচ আমাদেরকে জানায়নি।

 

আমি জাহিদকে বললাম, তুইও জানিস না আসল ঘটনা? ওয়েট আমি এক্ষুনি ফোন দিচ্ছি।

 

ফোন দিতেই ফোনের ওপারে বন্ধু একগাল হেসে বলল, মামুন, কেমন আছিস দোস্ত?
আমি বললাম, রাখ ব্যাটা! আগে বল তোর খবর কি? অতি উৎসাহে তো বিয়ে করে ফেললি একবার জানালিও না !
সে বলে, এই হুট করে হয়ে গেল আর কি!
আমি বললাম, ভেরি গুড, তা খেলাধুলা ঠিকমতো হচ্ছে তো?

 

আমার বন্ধু জানায় যে, খেলাধুলা খুব ভালো হচ্ছে। তবে তার চাকরি এখন বরিশালে, সে চেষ্টা করছে ঢাকা শিফট করার।

 

আমি তাকে বললাম, ভেরি গুড। এত দূরে থেকে তো ঠিকমতো সার্ভিস দিতে পারবি না। ঢাকা তো আসতেই হবে। আর বললাম, একবছর পরে আমাকে ফোন দিয়ে জানাতে যে তার দাম্পত্য জীবন কেমন যাচ্ছে।

 

দেখলাম, ফোনে আমার এসব কথা শুনে জাহিদ মুচকি মুচকি হাসছে।

 

একসময় আমরা ভোজনপর্ব সম্পন্ন করে রিকশা করে সিএমএইচ এলাম। কারণ রাতে সিএমএইচ খুব শান্ত থাকে। এখানে হাঁটাহাঁটি করতে আর কথা বলতে আরাম। কোনো অহেতুক শব্দ নেই।

 

সিএমএইচের ফুটপাতে নিরিবিলি হাঁটতে হাঁটতে জাহিদের সাথে গল্প করছি। মাঝে মধ্যে পাশ থেকে হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণ আসছে।

 

জাহিদ চিন্তার চাষ নামে একটা সংগঠন চালায় যেখানে স্কুলের বাচ্চাদের গবেষণা শেখানো হয়। এরকম আরো অনেক সামাজিক কাজের সঙ্গে জাহিদ সেই ছোটবেলা থেকেই যুক্ত। ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর কাজে সে ভীষণ পটু। অবশ্য এজন্যই আমরা ওকে বুদ্ধিজীবী বলে ডাকি।

 

হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম যে ফুটপাতে আমাদের ছায়াগুলো খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। দেরি না করে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম।

 

তারপর যা হয়, একটা কিছু পেলে সেটা নিয়ে খোঁচাখুঁচি করার স্বভাব আমার। সুতরাং ছায়া নিয়ে শুরু হয়ে গেল ছায়াবাজি।

 

এর ফাঁকে জাহিদের এক পরিচিত আংকেলের সাথে দেখা করে এলাম। উনার কাফ মাসলে প্রবলেমের কারণে সিএমএইচ ভর্তি আছেন। উনি বেশ উৎসাহ দেখালেন জাহিদের কাজের ব্যাপারে। ওদের একটা সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন সেটার খুব প্রশংসা করলেন।

 

তার সাথে খুচরো আলাপ শেষে আমরা আবার পথে নেমে হাঁটাহাঁটি করলাম। ফুটপাত থেকে ফুটপাতে এঁকে দিলাম পদচিহ্ন।

 

এভাবে হাঁটাহাঁটি, গল্প, খুনসুটি, আর ছায়াবাজি করতে করতে রাত গভীরে নামিয়ে রিকশা করে বাড়ি ফিরছি। ফেরার পথে জাহিদ নেমে যাওয়ার আগে ওকে বললাম, এরকম বন্ধুর সাথে ঘুরতে কতো ভালো লাগে তাই না।

 

জাহিদ মুচকি হেসে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

 

জাহিদের ছায়া কোক খাচ্ছে

 

ফুটপাতে আমার ছায়া
ছায়াবাজি কথোপকথন

 

ফুটপাতে গাছের ছায়া

 

ওখানে কে রে …

 

এই কূলে আমি আর ওই কূলে জাহিদ

 

জাহিদ, আমি ও গাছের ছায়া

 

বাড়ি ফেরার পথে রিকশাওয়ালা ভাইয়ের সাথে ছায়াবাজি

 

Leave a Reply