ক ছিলো তাঁতি। ঘরে বসে কাপড় বোনে। ব্যাপারীরা আসিয়া তাকে ঠকাইয়া কম দামে কাপড় কিনে নিয়ে যায়। তার বউ তাকে পরামর্শ দিল, ‘তুমি হাটে যাইয়া কেন কাপড় বেঁচো না?’ …

 

এ গল্প সিয়ামের লেখা। পুরো নাম সিয়াম আল নাহিয়ান। ক্লাস থ্রিতে পড়া সিয়াম আমাকে সত্যিই অবাক করে দিয়েছে। এত অল্প বয়সে এমন অসাধারণ প্রতিভা আমি আগে কখনো দেখি নাই। কিন্তু সে কথা যথাসময়ে হবে, আগে বলি রানা ভাইয়ের সাথে উনার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা।

 

রানা ভাই বললেন, চলো সুজানগর যাই।
আমি বললাম, সুজানগর কেন যাব?
আরে আমেরিকা থেকে আমার ক্যামেরা আসছে। চলো নিয়ে আসি। আর আমার গ্রামটাও ঘুরে আসলা। – রানা ভাইয়ের কণ্ঠে আন্তরিকতা।
ঠিকাছে, ভেবে দেখি, কালকে ফাইনালি জানাবো,  আমি আমার চিরায়ত উদাসীনতা নিয়ে বললাম।

 

এই ক্যামেরার গল্প জন্মের পর থেকে শুনে আসছি। কিছুদিন পর পর রানা ভাই একেকটা ক্যামেরার ছবি আমার ইনবক্সে দিয়ে বলেন, দেখতো এটা আসতেছে আমেরিকা থেকে। কেমন হবে?

আমি বলি, আরে ভাই, আগে হাতে আসুক তারপর বলেন। আপনার ক্যামেরার গল্প শুনে শুনে এই তিন বছরে আমার কান পচে গেছে।

রানা ভাই বলেন, আরে! ভালো জিনিসের জন্য একটু অপেক্ষা করতে হয়।

 

অপেক্ষা! এই একটি শব্দ আমি সবচেয়ে ঘৃণা করি। এই ছোট্ট জীবনে আমি কারো জন্য, কোনো কিছুর জন্যই অপেক্ষা করতে রাজি নই। তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হলে হোক।

 

যাহোক, পরদিন রানা ভাইকে বললাম, ঠিকাছে, আমি যাব। অফিস থেকে শনিবার ছুটিও নিয়ে নিলাম।

 

বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯) রানা ভাইয়ের বাসায় রাতের খাবার শেষ করে গা এলিয়ে বসেছি, এমন সময় জিয়া ভাইয়ের ফোন। জিয়া ভাইকে আমি বলি ‘ফরমাল ট্য্যুরিস্ট’। কারণ সি-বিচে গেলেও সে প্যান্ট-শার্ট ইন করে থাকে। জিয়া ভাই ফোন দিয়ে বললেন যে তিনি ফ্রি আছেন কালকে, আমাদের সাথে যেতে চান। আমরা আনন্দের সাথেই রাজি হয়ে গেলাম। বললাম, সকাল ৫টায় ফার্মগেট এ থাকবেন, ওখান থেকে সবাই একসাথে রওনা দেব।

 

আমরা একটু দেরিতে সকাল ৬টার দিকে ফার্মগেট থেকে গাবতলীর বাসে উঠলাম। তারপর গাবতলী থেকে আরিচা। আমি গাড়িতে ক্বাযা ঘুম আদায় করতে করতে গেলাম। রানা ভাই এক পর্যায়ে বললেন, তুমি ভালোই ফাযিল হইছো, মানুষ ক্বাযা নামায আদায় করে আর তুমি আদায় করো ক্বাযা ঘুম। এক সময় ঘুম ভেঙে বাসের  জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ‘সেলফি পরিবহন’। বাসের এমন অদ্ভুত নাম আমি ইহজনমে দেখি নাই। যাহোক আমরা আরিচা থেকে লঞ্চে উঠলাম পাবনা যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

ও নদী রে … একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে …

 

নদীর ঘোলা জল, নীল আকাশ, কখনো নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, কোথাও কাশফুল, কোথাও সবুজের গালিচায় সাদা বক, এইসব অতিপরিচিত দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় কাজির হাট পৌছালাম। সময় লাগল প্রায় দেড় ঘন্টা, যদিও রানা ভাই বলেছিলেন যে মাত্র ৪০-৪৫ মিনিট সময় লাগবে। রানা ভাইয়ের ট্যুর সংক্রান্ত কোনো তথ্য সম্পূর্ণ সঠিক হয়েছে এমন রেকর্ড নেই। সুতরাং এ নিয়ে আক্ষেপ করা চলে না। বললাম, রানা ভাই, আপনি নিজের বাড়ির পথের হিসাবটাও ঠিকঠাক জানেন না? রানা ভাই, নদীর স্রোতের গতি, বাতাসের বেগ ইত্যাদি নানান মারপ্যাঁচ দিয়ে তার কথার পক্ষে সাফাই গাইতে থাকলেন।

 

আমরা কাজির হাট থেকে সিএনজি নিয়ে কাশীনাথপুর এলাম, তারপর সেখান থেকে বাসে করে পাবনা। এর আগে কাশীনাথপুরে আমাদের ফরমাল ট্যুরিস্ট জিয়া ভাই তার এক পুরোনো কলিগের (মিজান ভাই) সাথে দেখা করে নিলেন।

 

পাবনা যেয়ে প্রথমে গেলাম দুবলিয়ায়, রানা ভাইয়ের বড় আপার বাসায়। আমরা এখানেই থাকব। আপা এবং ভাইয়া খুবই আন্তরিক মানুষ। তাদের বাড়িটা বাজারের ভেতর একদম রাস্তার পাশেই। ভালো লাগলো তাদের অত্যন্ত গোছানো সংসার দেখে। রানা ভাইয়ের ফ্যামিলির সবাই মিলে একসাথে থাকার স্বভাব। এটা এইসময়ে খুব একটা পাওয়া যায় না।

 

আমরা ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম।  আর খেতে খেতেই  অন্য অনেকের সাথে পরিচয় হলো। এর মধ্যে একসময়  কথা হলো সিয়ামের সাথে। সিয়াম রানা ভাইয়ের এক ভাগ্নির ছেলে। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। গড়ন হালকা পাতলা, হাতগুলো একদম কাঠির মত সরু। কথায় কথায় জানলাম যে এই ছোট্ট ছেলেটি গল্প লেখে। ওর মা গল্পের খাতাটা এনে পড়ে শোনালেন। একটা গল্পের নাম ‘বোকার বাণিজ্য’। কিন্তু সে বাণিজ্যের কথা আমরা পরে শুনবো।

 

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা গেলাম কনক দা’র বাসায়। কনক দা আমেরিকা থেকে রানা ভাইয়ের সেই আকাঙ্ক্ষিত ক্যামেরাটি নিয়ে এসেছেন। বছর দশেক আগে ডিভি পেয়ে আমেরিকা গিয়েছিলেন কনক দা, এখন তার পরিবারের অনেকেই সেখানে থাকেন। তিনি দেশে এসেছেন আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করতে আর পূজা উদযাপন করতে। বাবা-মা ,এক ছেলে, এক মেয়ে, আর ভাবিকে নিয়ে তার সংসার।

 

কিন্তু কনক দা’র সাথে দেখা হওয়ার আগে আমরা গেলাম রানা ভাইয়ের এক শিক্ষকের কাছে। রানা ভাইয়ের সেই স্যার আমাদের সাথে অনেকক্ষণ গল্প করলেন নিজের ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা কৌশলে তার জমিজমা হাত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি নানান জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছেন, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। বারবার ইউএনও-র কাছে গিয়েছেন, কোনো লাভ হয়নি। তার বাড়ির আঙ্গিনায় যে পূজা মণ্ডপ, বহুকাল ধরে তারা যেখানে পূজা করে আসছেন, সেটার অধিকারও হারিয়েছেন। এদিকে তার শারীরিক অবস্থাও বেশি ভালো নয়। কিছুদিন আগে দুই চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে। এছাড়াও আছে হার্টের অসুখ। খুব আক্ষেপের সাথেই বললেন, এখন ইচ্ছে করে ছেলেমেয়েদের বলি, এত লেখাপড়া করতে হবে না। তার চেয়ে নেতা হ। নেতা হলেই এদেশে সব হবে।

 

তিনি বললেন, তোমরা কিরকম সাংবাদিকতা করো? এই যে আমাদের উপর এত অত্যাচার হচ্ছে, কতবার আমি পত্রিকায় গেলাম, কেউ তো একবার এটা ছাপালো না! এই তোমাদের সাংবাদিকতা। সত্য বলতে এত ভয় তোমাদের !

 

আমরা নতমুখে তার কথা শুনলাম। যে দেশে কলমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় রাইফেল, সে দেশে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা ভেবে মন বিষণ্ণ হলো। আমরা একরাশ লজ্জা কাঁধে নিয়ে স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। রানা ভাই কিছুদিন চেষ্টা করেছিলেন স্যারের ব্যাপারটা নিয়ে একটা রিপোর্ট করাতে কিন্তু ছাপা হয়নি।

 

স্যারের বাসা থেকে বেরিয়ে আমরা ঠিক করলাম গাজনার বিল যাব। এরই মধ্যে রানা ভাই তার শৈশবের স্কুলটা দেখিয়ে নিয়ে এলেন। দেখলাম, স্কুল মাঠে চলছে ফুটবল খেলার বিশাল আয়োজন। লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠছে চারপাশ। ব্যান্ডপার্টির প্যাপো প্যাপো বাদ্যবাজনায় সবাই মাতোয়ারা।

 

স্কুল মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় উঠে রানা ভাইকে বললাম, রানা ভাই অটোতে যাব না, খোলা জিপ নেন। পাবনা এসে ভ্যানের নামকরণ করেছি ‘খোলা জিপ’। আমরা একটা খোলা জিপ ভাড়া করে রওনা দিলাম গাজনার বিলের উদ্দেশ্যে।

খোলা জিপে বসে আছি

সুজানগর থেকে গাজনার বিল, গ্রামের ভেতর দিয়ে পিচঢালা পথ। দুইপাশে কখনো সবুজ ক্ষেত, কখনো বিলভর্তি পানি, কখনো লোকালয়। আমি খোলা জিপের পেছনে পা ঝুলিয়ে বসে ছবি তুলতে তুলতে যাচ্ছি। মাঝপথে একটা ছোট্ট বাজারে থামলাম আমরা। রানা ভাই দশটাকা দিয়ে ৫টা সিংগাড়া কিনলেন। আমি বললাম, রানা ভাই, আমি এইসব ফালতু জিনিস খাবো না। রানা ভাই বললেন, আরে খাও খাও, খুব ভালো। আমি বললাম, আপনি আর জিয়া ভাই খান, আমারে এইসব সাইধেন না। রানা ভাই বললেন যে আমার মতো ‘ফালতু ট্যুরিস্ট’ তিনি আর দ্যাখেন নাই যে কিছুই খাইতে চায় না।

 

আমরা বিকাল ৪.৩০ এর দিকে গাজনার বিলে পৌছালাম। গাজনার বিলকে দ্বিখণ্ডিত করে চিনাখড়ার দিকে চলে গেছে একটি সড়ক। বিকেল হলেই মানুষের আনাগোনা হয় এখানে। দেখলাম অনেকগুলো ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ইঞ্চিনের নৌকা দেখলে অনিবার্যভাবেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বিলের ভেতর ভটভট শব্দে আমি নৌকা করে যাচ্ছি, এমন দৃশ্য কল্পনা করতেও আমার খারাপ লাগে। কিছুদিন আগে নিকলীর হাওড়ে গিয়েছিলাম সেখানে কোনো উপায়ন্তর না দেখে বাধ্য হয়ে নিয়েছিলাম ইঞ্জিনের নৌকা।

 

যাহোক, আমি বৈঠা-নৌকার খোঁজে নেমে পড়লাম। কিন্তু কোনোটাই খালি নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করে রানা ভাই আর জিয়া ভাইয়ের কাছে এসে দেখি তারা একটা ইঞ্জিনের নৌকায় বসে আছে। আমি বললাম, এইটাতে উঠছেন ক্যান? আমি তো এইটাতে যাব না। রানা ভাই আমাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে শেষে ব্যর্থ হলেন। আমি বললাম, আপনারা ভটভট শব্দ শুনে আসেন। আমি ওদিকে বিলের ধারে বসছি।

 

রাস্তার পাশে ঘাসে একটা খোলা জিপ পেয়ে  সেটার উপর বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। স্পিকারে মৃদুস্বরে কিছু ক্লাসিক গান ছেড়ে দিলাম। একটু পরে বিলের পানিতে পা ভেজালাম। তারপর একসময় ‘ছায়া ঘনাইলো বনে বনে’। আমি দু’একটা দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে নিয়ে মেঘের ছায়া দেখতে লাগলাম জলের আরশিতে।

গাজনার বিল

জিয়া ভাই আর রানা ভাই ইঞ্জিন নৌকার ভটভট শুনে ফেরত এলে, আমরা খোলা জিপে করে গেলাম পদ্মা নদীর ধারে। সেখানে এসে একটা নৌকা ভাড়া করলাম। তারপর পদ্মা নদীর থই থই পানিতে যেয়ে নৌকার ইঞ্জিন অফ করে দিয়ে ভেসে থাকলাম অনেকক্ষণ। নদীর মধ্যে আবার চর জেগেছে, সেখানে বাতাসে দোল খাচ্ছে শুভ্র কাশফুল, কিছু ছোটো পাখি নদীর পানি ঘেসে উড়ে যাচ্ছে এদিকে ওদিকে। এসব দেখে ভেসে যেতে যেতে একসময় সন্ধ্যা গড়িয়ে পড়ল গায়ে। আমরা নদীর পাড়ে অন্ধকারে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। তখনো জানি না যে কিছুক্ষণ পরেই কনক নামের যে মানুষটার সাথে আমার আলাপ হবে তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। তখনো জানি না যে, অল্প কিছুক্ষণের কথোপকথোনে তিনি আমার মধ্যে একটা ছাপ রেখে যাবে।

পদ্মার ঢেউ রে … মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা … যা রে…

 

পদ্মা নদীতে নৌভ্রমণ শেষ করে আমরা কনক দা’র বাসায় গেলাম। যাওয়ার পথে একটা বাজারে নেমে রানা ভাইয়ের জোরাজুরিতে মিষ্টি খেলাম। রানা ভাই তিন কেজি দই কিনলেন। তারপর খোলা জিপে করে কনক দা’র বাসা।

 

কনক দা’র যে বিষয়টা আমার প্রথমে চোখে পড়লো তা হচ্ছে তার সোজা হয়ে বসে থাকার ভঙ্গি ও তার কথাবার্তা। আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করলো তার চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা ও মানুষের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক কথার ফাঁকে একসময় কনক দা বললেন, আমি জানি আমি কোন ফ্যামিলির ছেলে। তাই আমার দ্বারা যদি কারো কোনো উপকার হয়, আমি সেটা করতে দ্বিধা করি না।

 

তিনি বললেন, আমেরিকা থেকে আসার সময় ওখানে চুল কাটাইনি, দেশে এসে কাটিয়েছি। তোমার কাছে হয়তো এটা তেমন কোনো বিষয় মনে হবে না, কিন্তু ভাবো ওখানে ১৫ ডলার দিয়ে চুলে কাটালে সেটা ওদের দেশের লোকের আর কতটুকু কাজে আসে কিন্তু দেশে চুল কাটিয়ে আমি কাউকে যদি ৫০০ টাকাও দিই, সেটা দিয়ে সে বাজার করে খাবে। এসব বিষয় আমি ভাবি।

 

কনক দা’র দৃষ্টিভঙ্গি অসাধারণ। আরো অনেক বিষয়ে কনক দা কথা বললেন। আমেরিকাতে তার সংগ্রামের কথা, বিশেষত প্রথম তিন-চার বছরে কিভাবে অনেক কষ্ট, সংগ্রাম, আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাকে সেখানে টিকে থাকতে হয়েছে। তিনি রানা ভাইকে বললেন, রানা, তুমি যদি আমেরিকায় থাকো কিছুদিন, দেশে এসে তোমার কোনো কাজ করতেই বাঁধবে না। আমাকে দ্যাখো, প্রয়োজনে আমি এখন রিকশা ভ্যানও চালাতে পারবো। একবারের জন্যও আমার বাঁধবে না।

 

কনক দা দেশে এসে সরকারি ব্যাঙ্কে কিছু একাউন্ট ক্লোজিং এর কাজে গিয়ে ভীষণ হতাশ হয়েছেন মানুষের অনিয়ম আর দূর্নীতি দেখে। তিনি বললেন, তোমাদের এখানে তো দেখি সবাই নেতা এখন। এই দেশ কিভাবে যে চলে!

 

তারপর একসময় আমরা রানা ভাইয়ের সেই বিখ্যাত ক্যামেরা দেখা হলো। কনক দা নিজেই এটা ওটা দেখালেন। রানা ভাই মনযোগী ছাত্রের মতো দেখতে লাগলেন, আমাকে বললেন, মামুন তুমিও ভালো করে দেখে নাও, তুমিই কিন্তু আমাকে শিখাবা। ক্যামেরা দেখার চেয়েও আমার আনন্দ হলো কনক দা’কে দেখে, তার মতো মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে।

 

আমাদেরকে বিদায় দিতে কনক দা রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। আরো অনেক গল্প বললেন। জীবন সম্পর্কে আমাদের কিছুটা হলেও জ্ঞান বৃদ্ধি পেল। তারপর একসময় কনক দা’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রানা ভাইয়ের বাসায় রাতের খাবার খেলাম। তারপর রানা ভাইয়ের আব্বা-আম্মার সাথে দেখা করে আবার দুবলিয়া’তে বড় আপার বাসায় এলাম।

 

এদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমি আর রানা ভাই ছাদে টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজছি। ফরমাল ট্যুরিস্ট জিয়া ভাই ততক্ষণে বিছানায় কাঁত।  ছাদে বেশকিছু ফলের ও ফুলের গাছ লাগানো। সেখানে একটা রজনীগন্ধা ফুলের কাছে দাঁড়িয়ে গন্ধ নিলাম কিছুক্ষণ। রানা ভাই জানালেন তার দুলাভাই ভীষণ সৌখিন মানুষ। গাছের প্রতি তার খুব আগ্রহ। পরদিন সকালে খাওয়া দাওয়া সেরে আমাদের পাবনা ভ্রমণ পর্বের ইতি টানলাম। যাওয়ার আগে সিয়ামের একটা ছবি তুলে নিলাম।

 

খোলা জিপের পেছনে বসে যখন এগিয়ে যাচ্ছি, তখনো আমার মাথার ভেতরে সিয়ামের গল্পের কথাটা ঘুরতে থাকলো। কিভাবে ক্লাস থ্রি’র একটা ছেলে এমন গল্প লেখে। আবার গল্পের নাম দিয়েছে ‘বোকার বাণিজ্য’। গল্পটা হুবহু তুলে দিচ্ছি –

 

এক ছিলো তাঁতি। ঘরে বসে কাপড় বোনে। ব্যাপারীরা আসিয়া তাকে ঠকাইয়া কম দামে কাপড় কিনে নিয়ে যায়। তার বউ তাকে পরামর্শ দিল, ‘তুমি হাটে যাইয়া কেন কাপড় বেঁচো না?’ পরামর্শটা তার খুব পছন্দ হলো। সে নৌকাটা ভালোভাবে সেচিয়া বড় একটা লম্বা দড়ি দিয়ে ঘাঁটে বেঁধে দিল।

 

রাত্রি হলে সে কাপড়ের বোঝা নৌকায় রেখে তাঁতি নৌকার দড়ি না খুলে নৌকা বাইতে আরম্ব করল। নদীতে ছিল খুব স্রোত। তাঁতি খানিক নৌকা বাইতে যায়। আবার স্রোত তাকে পিছিয়ে আনে। এভাবে এক রাত নৌকা বইয়ে একটু আগাইতে পারে না। তার মনে হলো, সে নৌকা নিয়ে অনেক দূর চলে গেছে।

 

সকালবেলা তাঁতির বউ নদীতে পানি আনতে এসেছিল। তাঁতি তার বউকে চিনতে পারে নাই। এবং তাকে জিজ্ঞাসা করে, মা লক্ষ্মী, বলতে পার এটা কোন ঘাট। তাঁতির বউ তাকে চিনতে পারল। বউকে মা বলা খুবই খারাপ। সে ঝাটা তুলে তাঁতিকে মারতে আসে। অল্পক্ষণে তাঁতি তার বউকে চিনতে পারল।

 

তাঁতি বলে, ওহ, সারা রাত নৌকা বইলাম। কিন্তু নিজের ঘাট থেকে এক ইঞ্চিও আগাইতে পারলাম না।
তাঁতির বউ আঙুল দেখে বলে, নৌকা যে বইলে, নৌকার দড়ি খুলেছিলে?
তাঁতি বলল, তাই তো, বড় ভুল হইয়াছে …

 

 

আমি গল্পটা শেষ করে আবার নামে ফিরে গিয়েছিলাম। গল্পের নাম, বোকার বাণিজ্য। অসাধারণ। জানি না এমন গল্প সে কখনো আগে পড়েছে কিনা বা কোনো গল্পের ছায়া অবলম্বনে লিখেছে কিনা। সিয়ামের মা আমাকে বলল, সে নাকি এর আগে ‘ভুত ও ভয়’ নামে একটা গল্প লিখেছিল যেটা পড়লে গা ছমছম করে ওঠে।

 

সে যাই হোক, আমি ভাবছি অন্য কথা।  বোকার মত মৃত্যুর ঘাটে দড়ি বেঁধে রেখে জীবনের নৌকা বেয়ে চলেছি প্রতিদিন – সিয়ামের গল্প পড়ে এমন উপলব্ধিতে আমার মন তো দুলে উঠতেই পারে।

 

সিয়ামের ভবিষ্যত সুন্দর হোক।

 

গল্পকার সিয়াম আল নাহিয়ান, তৃতীয় শ্রেণি

 

রানা ভাই দশ টাকা দিয়ে সিংগাড়া কিনছেন

 

ফরমাল ট্যুরিস্ট জিয়া ভাই ও আমি

 

বিলের মাছ

 

গাজনার বিলে আকাশের ছবি

 

বিলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সড়ক

 

টুপ করে নেমে এলো সন্ধ্যা

 

পদ্মা নদীতে … নৌকায় …

 

কাশফুল ঘাসবনে একা আনমনে

 

এ পথ গেছে কোনখানে… তা কে জানে… !

Leave a Reply