ভদ্রলোক বসে আছেন আমার পাশের সিটে। আমি দ্বিধা-দ্বন্দ কাটিয়ে তাকে করলাম একটি অদ্ভুত প্রশ্ন। বললাম, আপনার নাম কি সুমন?

 

আজ সারাদিন আকাশের কান্না দেখে কাটলো। সকালে অফিস থেকে গিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে কাজ সেরে আবার অফিসে ফিরতে ফিরতে দুপুর ৩ টা। শাহবাগ থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত আসতে প্রায় দেড়ঘন্টা শেষ। এই হলো যাদুর শহর ঢাকা। মেট্রোরেলের কাজ চলছে। অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি আর ধুলাবালিতে জীবন অতিষ্ট। এর মধ্যে বৃষ্টি প্রশান্তি আনার বদলে দুর্ভোগ বাড়ায়। আধাঘন্টার বৃষ্টি হলে রাস্তায় ওঠে বঙ্গপোসাগরের ঢেউ। এখানে মানুষ এবং সময় কোনোটারই দাম নেই।

 

অফিস শেষ হলে আমি আর আসিফ ভাই একসাথে বের হলাম। ততোক্ষণে সন্ধ্যা ৬টা পার হয়েছে। ফার্মগেট এসে ট্রাস্ট বাসে উঠে বসলাম। পাশাপাশি দুটো সিট ফাঁকা না থাকায় দুজনকে দুই সারিতে বসতে হলো। আসিফ ভাই তার মোবাইলে ক্রিকেট গেমস খেলতে শুরু  করেছেন। দেখলাম তিনি অসীম ধৈর্য নিয়ে বোলিং করছেন। আমি বললাম, আরে আপনি কি বোলিং করতেছেন নাকি? ধুর! অটোপ্লে দিয়ে দেন। তারপর ব্যাটিং করেন। বোলিং করে কোনো মজা নাই।

 

আসিফ ভাই নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন, আরে ভাই। ব্যাটিং বোলিং দুইটাই করতে হবে। নাহলে আর খেলার মজা পাওয়া যায় নাকি?

 

একসময় ব্যাটিং করার জন্য আমি আসিফ ভাইয়ের মোবাইল হাতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেলাম। বহুদিন মোবাইলে ক্রিকেট গেমস না খেলায়, অপরিক্কতার কারণে কয়েকটা উইকেট পড়ে গেল দ্রুত। খেয়াল করলাম আমার পাশে বসা ভদ্রলোক আমার শোচনীয় অবস্থা উঁকি দিয়ে এক ঝলক দেখে নিলেন। ঠিক তখনই তার মুখের দিকে ভালোভাবে খেয়াল করে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আরে, এ তো সুমন ভাই!!

 

না, সুমন ভাইয়ের আমাকে চেনার কথা না। সুমন ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ছিলো খেলার মাঠে। তখন আমি ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ি। আমরা থাকতাম ঢাকার কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে। টিনসেড কোয়ার্টার যার নাম ছিল ‘রূপসা কোয়ার্টার’। আমাদের বাসা নাম্বার ছিলো ১৬০ এর ৩। ১৬০ এর সারির সামনে ছিলো ১৫৯। ১৫৯ এর ১ এ ছিলো সাইফুল। ৩ এ ছিলো শাকিল। ১১তে ছিল জেনিল। খুব সম্ভবত ১৩তে ছিলো রানা। এছাড়া রূপসা কোয়ার্টারে তখন জব্বার, ঝুন্নু, জিসান, ইমন, আরো কতজন যাদের নাম এখন আর মনে নেই এমন বন্ধুদের সাথে কাটত ক্রিকেটমুখর একেকটি দিন।

 

আমি পাশে সুমন ভাইকে লক্ষ্য করছি। উনি কানে হেডফোন গুঁজে রেখেছেন। একটু আগে কার সাথে যেন কথাও বললেন। বাস জাহাঙ্গীর গেইটের জ্যামে আঁটকে থাকার সময় উনি মাথা সামনের সিটে হেলান দিয়ে ঝুকে আছেন। আমি ভাবছি আমার কি করা উচিত? সুমন ভাইয়ের সাথে আমার খুব একটা ইন্টিমেসি ছিলো না, তাছাড়া তখন তো খুব ছোট। আমাকে চিনতে পারার কোনো কারণ নেই তার। সুতরাং আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। যে অপরিচিত ছিলো তাকে অপরিচিতই রাখবো নাকি নতুন করে পরিচিত হবো? সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কিছুটা আড়ষ্ট লাগছে। তারপর ঠিক করলাম, ঠিকাছে এটাকে একটা খেলা হিসেবেই দেখা যাক। দেখা যাক কি ঘটে?

 

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খুব খারাপ করায় আসিফ ভাইকে মোবাইলটা ফেরত দিলাম। বললাম, এবার আপনি সামলান। দেখি কেমন পারেন। আসিফ ভাই বললেন, মাত্র ৩০ রান করেছেন ৫ ওভারে ! এই ম্যাচ কি আর জেতানো যায়!

 

বালুঘাট গেট দিয়ে ঢুকেই বাম হাতে বিশাল মাঠ। মাঠের শুরুতে একটা বড় লম্বা গাছ ছিল। এই গাছটাকে স্ট্যাম্প বানিয়ে শর্টপিচ খেলতাম আমরা। আমি তখন ছোট। খুব যে ভালো খেলতে পারতাম তাও নয়। তবু সৈকত ভাই, শ্যামল ভাই, রানা ভাই, বাবলু ভাই, রিমন ভাই, শৈবাল ভাই সবার সাথে মিশে ক্রিকেট খেলতাম এই মাঠেই। টেপ-টেনিসের সেই দিনগুলো আমার শৈশবের অনেকটা যায়গা দখল করে আছে।

 

প্রতিদিন বিকেলেই লং-পিচ খেলা চলতো। বাবলু ভাই ম্যাকগ্রার স্টাইলে বল করতেন। প্রায় সব বল লেগস্টাম্প বরাবর অনেকটা ইয়োর্কার ধরণের। খুব কঠিন ছিলো খেলা। সুমন ভাই মাঝে মধ্যে খেলতে আসতেন। চশমা পরতেন। খুব আগ্রেসিভ ধরণের ব্যাটিং করতেন। বল পেলেই লম্বা লম্বা ছয়। খেলা শেষ হতো মাগরিবের আযানের সময়। আযান শুনে সবাই খেলা শেষ করে কাছেই সেন্ট্রাল মসজিদে নামায আদায় করতে যেতাম।

 

ক্রিকেট ছাড়াও ভলিবল খেলা হতো। একবার দেখি, ভলিবল খেলতে গিয়ে রানা ভাইয়ের প্যান্ট পেছন দিয়ে ছিঁড়ে একাকার অবস্থা। তবু রানা ভাই খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন মান-ইজ্জতের পরোয়া না করেই। উনার এই ড্যামকেয়ার ভাবটা আমার খুব ভালো লাগত। রানা ভাই হাঁটতেন কাঁধ ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে। আমাদের বাসার ঠিক সামনে ছিল শাকিলদের বাসা। শাকিলের বড় ভাইয়ের নাম শাওন। শাওন ভাইয়ের ছিল লম্বা চুল। রানা ভাই আর রিমন ভাই প্রায়ই আসতেন শাওন ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিতে। শাওন ভাই সাউন্ডবক্সে গান বাজাতেন জেমস, এলআরবি বা হাসানের সেইসব যাদুকরি গান। তখন অবশ্য বড়দের নিষেধ ছিলো এসব গান শোনায় কিংবা বড় বড় চুল রাখায়। তখন ব্যান্ডের গান শোনা আর বড় চুল রাখা মানেই ধরা হতো বখাটেপনা।

 

আজ থেকে প্রায় ১৬/১৭ বছর আগের কথা। এত আগের কথা সব যেন আজ ভেসে উঠছে চোখের সামনে। এমনই হয় – কোনো পরিচিত মুখ, শব্দ, গন্ধ, কিংবা হঠাৎ কোনো অনুভূতি শৈশবে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। অতীতভ্রমণ হয় মানুষের। সুমন ভাইকে দেখে আমার অতীতভ্রমণ হলো। ঠিক করে ফেললাম যে, উনি আমাকে না চিনতে পারলেও আমি কথা বলবো এক্ষুনি। জানতে চাইব উনার বাকিসব বন্ধুদের কথা।

 

তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাইয়া, আপনার নাম কি সুমন?

সুমন ভাই বললেন, হ্যাঁ।

আমি বললাম, ছোটবেলায় বালুঘাট মাঠে আমি আপনাদের সাথে খেলতাম। সৈকত ভাই, রানা ভাই, বাবলু ভাই আরো অনেকে। উনাদের কথা মনে আছে আপনার?

সুমন ভাই বললেন, হ্যাঁ, সৈকত তো আমার জুনিয়র ছিলো। অনেকদিন যোগাযোগ নেই। তুমি কোথায় থাকতে?

 

আমি বললাম যে আমি আপনাদের পেছনের লাইনেই থাকতাম। ১৬০ এর ৩ এ। আমাদের পাশের লাইনে শৈবাল ভাই থাকতো – এটা বলাতে উনি বললেন, হ্যাঁ, ও তো আমার ব্যাচমেট ছিল।

 

কোয়ার্টারের একেকটা সারিকে আমরা বলতাম লাইন। কত কথা মনে আসছে। ঝড়ের দিনে দরজার কাঁচ দিয়ে বাইরে ঝড় দেখা। টিনের চালের উপর উঠে ঘুড়ি ওড়ানো। কাচের গুড়া আর আঠা দিয়ে সুতায় মাঞ্জা দেয়া। বাসার সামনে লাটিম খেলতাম। একদিন এমন জোরে টান মেরেছিলাম যে ঘরে থাকা শো-কেসে লেগে গ্লাস ভেঙে গিয়েছিল। আরো কত ধরনের খেলা। গোল্লাছুট, সাত চাড়া, খেজুরের বিচি ভেঙে চারগুটি, মার্বেল খেলা, আরো কতো কি।

 

সুমন ভাই বললেন উনার চেহারা অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে। আমি এতদিন পর চিনতে পারাতে উনি বেশ অবাকই হয়েছেন। বললেন, আমি তো বাইকে অফিসে যাই। বাইক নষ্ট হওয়াতে আজ বাসে যাচ্ছি, নাহলে তো দেখা হতো না তোমার সাথে। উনার মা মারা গেছেন কয়েক বছর হলো। বাবা রিটায়ার করেছেন। এখন থাকেন হাজী মার্কেটে। আমি বললাম, আমরা কোয়ার্টারে থাকার আগে হাজীমার্কেট এলাকায় ভাড়া ছিলাম বছর দুই/তিন মতো।

 

সুমন ভাই এখন একুশে টিভিতে চাকরি করেন। প্রায় ৮ বছর ধরে ওখানে আছেন। আমি বললাম, আমার অফিস ফার্মগেটেই, ডেইলি স্টার। আপনি চা খেতে চলে আইসেন।

 

কথায় কথায় আমরা একসময় ইসিবি চত্তর চলে এলাম। বাস থেকে নেমে বিদায় নিলাম সুমন ভাইয়ের কাছ থেকে। সুমন ভাই আমাকে উনার বাসার লোকেশন বুঝিয়ে দিয়ে বললেন ওদিকে গেলে যেন যাই। আমিও উনাকে অফিসে চা খেতে আসার দাওয়াত দিলাম।

 

আবার কবে উনার সাথে দেখা হবে জানি না। তবে মনের দ্বিধা এড়িয়ে উনার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছে। আমার শৈশবের হিরো ছিলেন উনারা। ক্রিকেট খেলার মাঠে যে উত্তেজনা; বোলিং, ব্যাটিং, কিপিং, হাসাহাসি, দুষ্টুমি, পরস্পরের সাথে যে দুর্দান্ত মিথস্ক্রিয়া – এর সবকিছু আমি দেখেছি শৈশবে বালুঘাট মাঠে। কখনো অংশ হয়েছি সে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের।

 

আজ সুমন ভাইয়ের সাথে দেখা কথা হওয়াতে জানলাম, আমার শৈশবের হিরোরা এখন আমারই মতো ৯-৫টা অফিস করেন, কেউবা ব্যবসায় জড়িয়েছে নিজেদের। যেভাবে মানুষ সংসারের যাতাকলে ফেঁসে যায়, সেভাবে তারাও ফেঁসে গেছেন। তবে যে যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক।  যদি কখনো তারা এই লেখা পড়ে, তারা জানবে, এখান থেকে ১৬/১৭ বছর আগেকার বিকেলগুলোতে একটি ছেলে তাদের মাঠজোড়া ছোটাছুটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিল।

 

 

সুমন ভাই

 

Leave a Reply