‘একটি সূর্যাস্তের ঠিক কী মানে? যখন নিস্তেজ মৌন রোদ ছড়ায় শহরের গাছগুলির ওপর; যখন কাকের কোলাহল সেই মৌনতাকে খানখান করে ভাঙ্গতে থাকে; যখন দিগন্তের আলো দ্রুত নিভতে থাকে আর ব্যাপক কুয়াশার ভিতর জড়ানো থাকে একটি রাত্রির ইঙ্গিত; যখন একটি শীত শীত দিনের শেষ বেলাকে কেউ ফিসফিস করে বলে:বিদায়। আজ সূর্যাস্তের সময় মনে হবে ঝরে গেল আরও একটা বছর।

 

ঝরে গেল আরও একটা বছর। এই অনুভূতি আমাকে কেমন অবশ করে দেয়। কেননা, জীবন আরও গভীরে গড়াল কিংবা হারাল মহাকালের কিছু মুহূর্তসমষ্টি-যে মুহূর্তসমষ্টি আমি লাভ করেছিলাম জন্মমুহূর্ত থেকেই। সেই মুহূর্তসমষ্টি কি আমার? মহাকালের তরফ থেকে আমাকে সচেতনভাবে দেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নটিই আমাকে বিব্রত করে দেয়। কেননা, আমি দেখেছি অভাবী নারী ফুটপাথে তার শিশুটিকে নিয়ে অনাহারে কাটাচ্ছে অর্থহীন মুহূর্তসমষ্টি; তবে আমি কেন আমার মুহূর্তসমষ্টিকে সুখি ও শিল্পায়িত করার জন্য অহরহ চেষ্টা করব? আমি কেন নিজেকে নির্বাচিত ও বিশেষ ভেবে উৎফুল্ল হয়ে উঠব? এই বোধ আমার স্নায়ূতন্ত্রকে বিকল করে দিতে যথেষ্ট।’

 

উপরের কথাগুলো ইমন জুবায়ের-এর লেখা।

 

প্রতিবছর আজকের দিনে এই কথাগুলো আমার কানে বাজতে থাকে অবিরাম। আমি নিজেকে বলি ‘ঝরে গেল আরও একটা বছর’। প্রতিবছর ৫ নভেম্বর আমার জীবন থেকে একটি করে বছর ঝরে পড়ে। বয়স একবছর বেড়ে যায় (নাকি কমে যায়!)।

 

জন্মদিন নিয়ে আমার বিশেষ কোনো আনন্দের অনুভূতি নেই। কেউ শুভেচ্ছা জানালেও আনন্দ পাই না বরং খানিকটা লজ্জা পাই নিজের অস্তিত্বের জন্য। আমার কাছে জন্ম বিষয়টা একটা এক্সিডেন্টাল ইনসিডেন্ট বা আকস্মিক ঘটনা, দূর্ঘটনাও বলা যেতে পারে। তাছাড়া জন্মের পর জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি  জীবনটাকে বয়ে বেড়ানো এক মহা বিড়ম্বনা ছাড়া আর কি।

 

সমাজ অবশ্য একটা ছক ঠিক করে দেয় বেঁচে থাকার। জন্ম-শিক্ষা-কর্ম-বিবাহ-সন্তান-সংসার-মৃত্যু। এ সাজানো ছকের বাইরে জীবন কাটালে মানুষ সমাজভ্রষ্ট হয়। ছকের বাইরের মানুষকে দেখতে কেউ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, বিশেষ করে সে যদি নিজে ছকবন্দী হয়। মানুষ সারাজীবন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করে শেকলে আঁটকে থাকে।

 

তারপরও কোনো মানুষই পুরোপুরি মুক্ত নয়। মুক্তির ধারণাটাই ঘোলাটে। মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই পরাধীন, যদিও সারাজীবন তাকে স্বাধীনতার বড় বড় বুলি কপচাতে দেখা যায়। জন্মের পর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, আত্মীয়-পরিজন, সামাজিক রীতিনীতি ইত্যাদির শেকলে বাঁধা পড়তে পড়তে একটি শিশু বেড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানায় অবস্থানের উপর ভিত্তি করে গড়ে ব্যক্তিত্ব, শুভ-অশুভ বোধ, চিন্তার ধরণ ও কাঠামো। কখনো তার জ্ঞানচক্ষু খোলে, কখনো সে আমৃত্যু রয়ে যায় অজ্ঞান ও অন্ধ। তারপর একদিন মৃত্যুতে জীবনের দেনা শোধ করে দেয়।

 

জীবনকে আমি এখন ধর্মের লেন্সে দেখিনা। তাই মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে বিশেষ ভাবিত নই। জানিনা বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার আচরণে, ব্যবহারে, বা চিন্তায় এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা।

 

একেক সময় মনে হয় সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা দারুণ ব্যাপার। আবার মনে হয়, এটা তো ভীষণ সাবজেক্টিভ চিন্তা। আমি ভালো আছি মানেই তো সব ভালো নেই। পুঁজিবাদী কাঠামোতে সাঁতার কাটতে কাটতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ খাঁদে পড়ে যাচ্ছে। মানুষ মানুষের বুকে তাক করছে গুলি। ধনী দরিদ্র্যের ব্যবধান দিনকে দিন বাড়ছে। পত্রিকা খুললেই হত্যা-যখম-খুন-ধর্ষণ। পৃথিবী শান্ত ছিলো কবে?

 

ছোটবেলা যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের খবর শুনতাম, তখন ভাবতাম আমি বড় হলেই বুঝি সব যুদ্ধ থেমে যাবে। এখন বড় হয়ে দেখছি কিছুই থামেনি, বরং মানুষে মানুষে সহিংসতা বেড়েছে। ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জারের এই কানেক্টিভিটির যুগে এসে মানুষ হয়ে উঠছে আরও বেশি নিঃসঙ্গ। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একা। একই সাথে বাড়ছে মেকি ঠাটবাট আর গিমিকবাজি। সবাই দেখাতে চায় যে সে অন্যের চেয়ে সুখী; অথচ বাস্তবে তার মনে শান্তির ছিটেফোটাও নেই।

 

যে ঢাকা শহরে থাকছি, সেটা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় শীর্ষে।  শহরের দূষিত পরিবেশ, খাদ্যে ভেজাল, চাকরি করতে গেলে ঘুষ, উন্নয়ন প্রজেক্টের নামে লোপাট হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। চলতে ফিরতে কোনো নিরাপত্তা নেই মানুষের। প্রতিদিন ঘটছে সড়ক দূর্ঘটনা। হাসপাতাল ভর্তি রোগীতে। কিছুদিন আগেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হলো। অসুস্থ মানুষ নেই এমন কোনো পরিবার পাওয়া যাবে না ঢাকা শহরে। মোটের উপর এই হলো চারপাশের মানুষের জীবনযাপন। ক্ষমতাসীনরা নির্বিকার। তারা জিডিপি বৃদ্ধির গ্রাফ ছাড়া কিছু বোঝে না।

 

এদেশে মানুষের পেটভর্তি ইমোশন আর মগজভর্তি ধর্মীয় গোঁড়ামি –  এছাড়া তাদের গৌরব করার মতো কিছু নেই। শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠে ক্ষমতাসীন ক্যাডাররা নিরীহ ছাত্রদের ইচ্ছামতো মারছে। পুলিশ নিজেদের বিকিয়ে দিয়েছে সরকারের কাছে। পত্রিকার টুটি চেপে ধরেছে সরকার। তো এইসব নানাবিধ বিপত্তির মধ্যে বেঁচে থাকাটাই একটা বিরাট ব্যাপার মনে হয় ইদানিং। একটা অতি আশ্চর্য ঘটনা।

 

জন্মদিন নিয়ে তাই আলাদা কোনো ভাবনা নেই। একটা লজ্জিত ভাব আছে বরং। এই নিষ্ঠুর দেশে একটা অদ্ভুত সময়ে আকস্মিকভাবে জন্ম নিয়ে দিনের পর দিন বেঁচে থাকছি – একসময় মৃত্যুতে বিলীন হয়ে যাওয়ার জন্য – এটাই কি নিয়তি? যদি তাই হয়, তাহলে জন্মদিন নিয়ে উচ্ছ্বসিত হবার সুযোগ কোথায়?

 

আমি কেন নিজেকে বিশেষ ভেবে, নিজের জীবনকে সুখী ও শিল্পায়িত করে তুলতে অহরহ চেষ্টা করবো? – ইমন ভাইয়ের মতো আমারো মনে এই একই প্রশ্ন জাগে।  সারাদিন কানে বাজতে থাকে –

 

‘ঝরে গেল আরও একটা বছর। এই অনুভূতি আমাকে কেমন অবশ করে দেয়। কেননা, জীবন আরও গভীরে গড়াল কিংবা হারাল মহাকালের কিছু মুহূর্তসমষ্টি-যে মুহূর্তসমষ্টি আমি লাভ করেছিলাম জন্মমুহূর্ত থেকেই। সেই মুহূর্তসমষ্টি কি আমার? মহাকালের তরফ থেকে আমাকে সচেতনভাবে দেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নটিই আমাকে বিব্রত করে দেয়। কেননা, আমি দেখেছি অভাবী নারী ফুটপাথে তার শিশুটিকে নিয়ে অনাহারে কাটাচ্ছে অর্থহীন মুহূর্তসমষ্টি; তবে আমি কেন আমার মুহূর্তসমষ্টিকে সুখি ও শিল্পায়িত করার জন্য অহরহ চেষ্টা করব? আমি কেন নিজেকে নির্বাচিত ও বিশেষ ভেবে উৎফুল্ল হয়ে উঠব? এই বোধ আমার স্নায়ূতন্ত্রকে বিকল করে দিতে যথেষ্ট।’

 

 

Leave a Reply