‘কুঁ ঝিক ঝিক…কুঁ ঝিক ঝিক…

তখন বি আই টি তে পড়ি। ২০০০-০১ এর কোনো এক আবেশ রোদ দুপুর। হোস্টেল থেকে বের হয়েছি,আমি আর রুপম। রুপম আমার সাথে ব্যাকপ্যাক দেখেই বুঝে গ্যাছে,যথারীতি আমার যাত্রা উদ্দেশ্যবিহীন। রিক্সা নিয়ে ঘুরছি পদ্মা পাড়ের শহরে। ঘুরতে ঘুরতে ট্রেন স্টেশন এর কাছাকাছি চলে আসি।

‘রানা ভাই,ট্রেন যায়-‘ রুপমের কথা শেষ হতেই দেখি দুলকি চালে ট্রেন যাচ্ছে। রিক্সা থেকে নেমে ভোঁ দৌড় দুজনের। একদম শেষ মুহুর্তে উঠে যাই ট্রেনে। রুপম ছুড়ে দেয় আমার ব্যাকপ্যাক আর ‘স্বর্নপাতা’ নিকোটিন। তখনও জানিনা ট্রেন এর গন্তব্য।

সময়টা ছিলো নির্ভার,সময়টা ছিলো বোহেমিয়ান,সময়টা ছিলো অনিশ্চয়তাকে নিশ্চিন্তে বন্ধু ভেবে ঝাঁপ দেয়ার’।

 

রানা ভাইকে তারই লেখা এই শেষ লাইনটা দিয়ে ডিফাইন করা যায়। রানা ভাই মানেই ‘অনিশ্চয়তাকে বন্ধু ভেবে ঝাঁপ দেয়া’।

 

রানা ভাই সবার কাছে পরিচিত ‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে’ কিংবা ‘মার ঘুরিয়ে’র গীতিকার হিসেবে। কিন্তু সত্যি বলতে তার এই গীতিকার পরিচয়টা আমার কাছে মুখ্য নয়। আমার কাছে তিনি একজন দুঃসাহসী মানুষ। আমার সবটা কৌতূহল তার উদ্দেশহীনতা নিয়ে, এক জায়গায় থিতু না হওয়ার স্বভাবটা নিয়ে। এবং এর সাথে অনিবার্যভাবেই আছে লিরিকের পেছনের গল্প জানার আগ্রহ।

 

রানা ভাইয়ের সাথে দেখা করতে এসে, এলিফেন্ট রোডের বাটা’র মোড়ে চরকির মতো ঘুরছি। কারণ গুগল ম্যাপ আমার সাথে অদ্ভুত আচরণ করছে। আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে যে আমি গন্তব্যে পৌঁছে গেছি, অথচ আমি পৌঁছায়নি, আঁতিপাঁতি করে খুঁজছি গন্তব্য কিন্তু পাচ্ছি না। পরে বুঝেছি যন্ত্রের ত্রুটি থাকে, সে সবসময় সঠিক গন্তব্য বাতলে দিতে পারে না, কিন্তু মানুষ পারে।  

 

৬ নভেম্বর রানা ভাইয়ের এ্যালবাম অচিনপুরের গান বের হয়েছে। রানা ভাই ইনবক্সে ই-কার্ড পাঠিয়ে বললেন, চলে এসো, নিমন্ত্রন রইলো। আমি বললাম, ইনশাআল্লাহ দেখা হবে।

 

আমার ইচ্ছা ছিল যাবার। এতদিন পর রানা ভাই দেশে এসেছেন। এসেই আবার গানের এ্যালবাম, নাম অচিনপুরের গান। রানা ভাই অল্প দিনের জন্যে দেশে এসেও অনেক কাজ করে যান। ৬ তারিখ সকালে আমি গেলাম ইকুরিয়া বিআরটিএ অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স এর বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের জন্য। সেখানে লম্বা লাইন পেরিয়া কাজ শেষ করে অফিসে ফিরতে ফিরতে দুপুর হলো। তারপর রাজ্যের ব্যস্ততা। অবশেষে যখন ফ্রি হলাম ততোক্ষণে ছ’টা বেজে গেছে। রানা ভাইয়ের এ্যালবাম অবমুক্ত হওয়ার সময় ছিলো বিকেল পাঁচটা। মন খারাপ হলো। রানা ভাইকে ইনবক্সে জানালাম যে অফিসে ফেঁসে গেছি।

 

বাসায় ফেরার পথে ফেসবুকে দেখলাম, রানা ভাইয়ের অনুষ্ঠানে গান গাইছেন পার্থ বড়ুয়া সহ আরও অনেকে। আমার মন খানিকটা বিষণ্ণ হলো।  

 

পরদিন রানা ভাই আবার ইনবক্স করলেন। বললেন, আজ আসো। নালন্দা বুক ক্যাফেতে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে।

 

খুশি হলাম। তাহলে আজ আরেকটা সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে রানা ভাইয়ের সাথে দেখা করার। অফিস শেষে বের হলাম নালন্দা বুক ক্যাফের খোঁজে। গুগলিং করে জানা গেল যেতে হবে এলিফ্যান্ট রোডে। চলে গেলাম রিকশা করে। আজিজ মার্কেট পর্যন্ত রিকশা গেল, তারপর গুগল ম্যাপ দেখে হাঁটছি। একসময় গুগল ম্যাপ দেখালো যে আমি গন্তব্যে চলে এসেছি। অথচ চারপাশে তাকিয়ে কোথাও নালন্দার অস্ত্বিত্ব পেলাম না। দু চারজনকে জিজ্ঞেস করলে তারা এমন ভাব করলো যে এই নাম তারা ইহজনমে শোনে নাই। যাহোক, শেষমেশ বাধ্য হয়ে রানা ভাইকেই ফোন দিলাম। রানা ভাই লোকেশন বুঝিয়ে দিলে সোজা গিয়ে হাজির হলাম নালন্দা বুক ক্যাফেতে। দীপনপুর থেকে কিছুটা সামনে রাস্তা সংলগ্ন ছোট একটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেই নালন্দা বুক ক্যাফে। এটা আসলে নালন্দা প্রকাশনীর একটা বইয়ের দোকান যেখানে বই পড়তে পড়তে চা-কফিও খাওয়া যায়।

 

রানা ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় সামহোয়্যারইন ব্লগ-এর মাধ্যমে। সামহোয়্যারইন ব্লগে রানা ভাই নস্টালজিক নামে লিখতেন। এখনও লেখেন মাঝে মাঝে। আমি ভালো লেখা পেলেই বারবার পড়ি; শব্দ আর বাক্যের যাদুতে মুগ্ধ হতে। রানা ভাইয়ের শব্দচয়ন আমাকে মুগ্ধ করলো। নিয়মিত পড়তাম, মন্তব্যও করতাম। একটা ইন্টারএকশান তৈরি হলো ধীরে ধীরে। তারপর একদিন সামহোয়্যারইন ব্লগের একটা অনুষ্ঠানে দেখা হলো। তখনো জানতাম না রানা ভাই গান লেখেন; তার গান সঞ্জীব চৌধুরী, বাপ্পা মজুমদার, আর পার্থ বড়ুয়ার কণ্ঠে ভর করে জনপ্রিয় হয়েছে এরই মধ্যেই।  ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলাতে রানা ভাইকে আমার বই ফাঁদ ও সমতলের গল্প উপহার দিলাম। আর তার কাছ থেকে নিলাম কবির তখন সওদাগরি মন।  

 

নালন্দাতে বসে রানা ভাইয়ের সাথে আলাপ হচ্ছিল। এমন সময় তার বই ‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে’ এর দ্বিতীয় সংস্করণের বই এলো। আমরা ঝা-চকচকে নতুন বই হাতে নিয়ে দেখলাম। রানা ভাই বললেন, প্রচ্ছদটা তো বেশ সুন্দর হয়েছে, বইটা ধরে আমার সেই প্রথমবারের মতো অনুভূতি হচ্ছে।

 

‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে’ বইটারই মোড়ক উন্মোচনের ছোট্ট অনুষ্ঠান। রানা ভাইয়ের পরিচিত কিছু মানুষের ছোট একটা জটলা।  

 

একসময় অনুষ্ঠান শুরু হলো। রানা ভাইয়ের ছেলেবেলা কেটেছে হাইকোর্ট কলোনিতে। সবুজের সান্নিধ্যে দুরন্তপনায় বড় হয়েছেন তিনি। তার সেই হাইকোর্ট কলোনির বড় ভাইয়েরাও এলেন কয়েকজন। রানা ভাইয়ের স্ত্রী মিশু ভাবি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করলেন।

 

প্রথমে রানা ভাই তার বইটা সম্পর্কে জানালেন।  বললেন, অনেকগুলো নতুন লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই সংস্করণে। যারা বইটি পড়েনি তাদেরকে পড়ার আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি বর্ষা দুপুর প্রকাশনীকেও ধন্যবাদ দিলেন বইটা দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের জন্য।

 

এরপর রানা ভাই ও তার লেখা সম্পর্কে সকলের অনুভূতি প্রকাশের পালা। এখানে যারা এসেছেন তাদের প্রত্যেকে রানা ভাইকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসেন। রানা ভাইয়ের লেখাকে শুধু নয়, ব্যক্তি রানা ভাইয়ের ব্যাপারেও তারা সমান আন্তরিক। অন্যের জবানিতে রানা ভাইকে জেনে বেশ আনন্দ হলো আমার।

 

রানা ভাই এই শহরে বেড়ে উঠেও ঠিক শহরের মানুষের মতো হননি। তার মানসিক গঠন রাস্টিক। তিনি ভালোবাসেন প্রকৃতি। শহুরে কোলাহল নয় বরং তার পছন্দ আদিগন্ত সবুজ আর আকাশভর্তি পাখি । একই সাথে তিনি আবার খানিকটা বেপরোয়া। রাজশাহীর বিআইটিতে (বর্তমানে রুয়েট) পড়ার সময় আবিষ্কার করলেন তার আর যন্ত্রকৌশল ভালো লাগছে না। ব্যাস, হুট করে ছেড়ে দিলেন। এখানে উনার এক বড় ভাই পুতু ভাইয়ের মুখেই শুনলাম রানা ভাই একবার দেশের বাইরে গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। কিন্তু তা শেষ না করেই ছেড়ে চলে এসেছিলেন। রানা ভাই দুঃসাহসী। ছেড়ে দেয়ার ক্ষমতা সবার থাকে না। ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষকে নানান হিসাবনিকাশ করতে হয় বলেই তার হুট করে কোনো কিছু ছেড়ে দেবার জো নেই। রানা ভাই এই দিক থেকে অনন্য। তিনি মনের আহ্বানকে অগ্রাহ্য করেন না। একবার দেশে ফিরে বিজ্ঞাপনী সংস্থা গ্রে – তে কাজ নিয়েছিলেন। সেখানেও বেশিদিন স্থায়ী হননি। দুম করে ছেড়ে দিয়েছেন চাকরি।

 

আমি বললাম, রানা ভাই আপনি কি এখনো এমাজন এর চাকরিটা করছেন?

 

রানা ভাই বললেন, হ্যাঁ করছি। কিন্তু ছাড়ার সময় এসেছে মনে হচ্ছে। তাছাড়া সামনের বছর থেকে ওয়েলস-এ থাকতে হবে। মিশু কার্ডিফে জয়েন করবে।

 

রানা ভাই এখন লন্ডনে থাকেন। দেশ থেকে অনেক দূরে। তবু রানা ভাইয়ের মন জুড়ে থাকে হাইকোর্ট কলোনির নস্টালজিয়া, চোখভর্তি শব্দপাখির দল। আমার ভাবতে ভালো লাগে লন্ডনের স্টারবাকসে বসে কফি খেতে খেতে কেউ দেশ নিয়ে ভাবছে, শব্দে ধরতে চাইছে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু ভাবনা জাগানিয়া।

 

রানা ভাইয়ের গান 

১. আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে 

২. মার ঘুরিয়ে 

৩. তোমার কি আর দুঃখ পেলে চলে 

৪. স্যাটেলাইট 

৫. তুমি নাই 

 

এ্যালবাম 

১. নস্টালজিক

২. অচিনপুরের গান 

 

রানা ভাইয়ের বই

১. আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে

২. টুকরো নাগরিক জার্নাল

৩. কবির তখন সওদাগরি মন

৪. শব্দ পাখির দল 

৫. রুল টানা খাতা 

 

রানা ভাইয়ের ব্লগ 

নস্টালজিক (সামহোয়্যারইন ব্লগ) 

 

আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে

 

 

আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে – বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

 

অচিনপুরের গান

 

 

মেঠোপথে রানা ভাই ও মিশু ভাবি

 

Leave a Reply