সাইজি বার বার নিষেধ করে দিচ্ছেন, ‘আলেক’ দেয়ার আগে কেউ খাবেন না।

রাত সাড়ে বারোটা। উপরে পূর্নিমার চাঁদ আর নিচে ঘাসের উপর পাটি পেতে আমরা প্রায় শ’দুয়েক মানুষ। সকলের সামনে খাবার প্লেট কিন্তু কেউ খেতে পারছি না। আলেক দেয়ার আগে খেতে মানা। আমরা বসে বসে ভাবছি ‘আলেক’ দেয়া বিষয়টা আসলে কি?

 

গতদিন, ১৩ নভেম্বর, অফিস শেষে হাতে তেমন কোনো কাজ না থাকায় ভাবলাম নাটক দেখে আসি। বেশ অনেকদিন যাওয়া হয় না শিল্পকলায়। প্রথম আলো থেকে জানলাম আজ দুটো নাটক আছে। একটা বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শন নির্ভর ‘মহাজনের নাও’, আরেকটা হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে ‘দেবী’। মহাজনের নাও অনন্যসাধারণ একটি নাটক। নাটকটি এর আগে দেখেছি বিধায় সিদ্ধান্ত নিলাম দেবী দেখব। দেবী মঞ্চস্থ করবে বহুবচন নাট্যদল।

 

নাটক দেখা শেষ হলো রাত ন’টার দিকে। বের হয়ে শিল্পকলা একাডেমির মাঠে এসে দেখি বাউলদের একটা জটলা। লালনের গান হচ্ছে সেখানে। জানতে পারলাম চলছে সাধুমেলার ৮ম আসর।

 

মিশে গেলাম ভীড়ের মাঝে। আমি ভীড়ের মানুষ হয়ে আনন্দ পাই। ভীড়ের ভেতর সেঁধিয়ে থেকে জানতে ইচ্ছা হয় তাদের জীবন কেমন যাচ্ছে। বাউলদের সম্পর্কে আমার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। বাইরে থেকে তাদের অপরিচ্ছন্ন জীবনযাপন আমার অসহ্য লাগে। অবশ্য লালনের কিংবা বাউলদের গান যে হৃদয় আকুল করে, ভাবনা জাগায় – সেটা বলাই বাহুল্য।

 

মাঠে কাপড় বিছিয়ে গোল করে বসে আছেন একঝাক বাউল। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখাই বেশি, অল্প কয়েকজন নারী বাউলও আছেন। একজনকে দেখলাম, সারাক্ষণ মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে আবার নিজের সেলফি তুলছেন। দেশের নানান প্রান্ত থেকে তারা এসেছেন।

 

লালনের গানকে তারা গান না বলে বলেন ‘লালনের ভাববাণী’। যেমন – সঞ্চালক বাউল হীরক রাজা বললেন, এখন আপনাদের সামনে লালনের একটি ভাববাণী পরিবেশন করবেন অমুক বাউল। ব্যাস, শুরু হয়ে যাবে গান। সব যন্ত্রীরা তাদের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পরিবেশটাকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। মন্ত্রমুগ্ধ দর্শকেরা আপ্লুত হয়ে উঠবেন। কখনো গানের তালে তালে হাততালি পড়বে।

 

কোনো কোনো বাউল গান গাওয়াটাকে ভীষণ মজার একটা ব্যাপার করে তোলেন। মঞ্চে অনবরত ছোটাছুটি, যন্ত্রীদের সাথে মজার অঙ্গভঙ্গি, লাফালাফিসহ বিচিত্র সব কাজের মধ্য দিয়ে দর্শককে আনন্দে মাতিয়ে রাখেন বাউলেরা।

 

কয়েকটি গান এত ভালো লেগেছে যে এখনো কানে বাজছে, এর মধ্যে একটি এমন –

মনচোরা পড়েছে ধরা
রসিকের হাতে
ও সে ধরেছে চোরকে
হাওয়ার ফাঁদ পেতে ।।

 

এমনই একের পর এক গান শুনছি। মাঝে মধ্যে ঢোল নিয়ে ঢোলক উঠে আসছেন গায়কের সাথে রঙ্গ-রসিকতা করতে। বাউলদের মধ্যে একজন এমন উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি করলেন যে দর্শক সবাই হেসেই খুন। কেউ আবার তার মাথায় বেঁধে রাখা চুল খুলে দিয়ে গানের তালে অনবরত ডানে বায়ে নাড়ছেন। গান গাইতে যেয়ে শিল্পী যখন নিজেই গানটা পূর্ণমাত্রায় উপভোগ করেন, তখন তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর এক দৃশ্য হয়ে দাঁড়ায়। এসব অনুভূতি অমূল্য।

 

রাত বাড়ছে। তবুও কোনো দর্শকের ওঠার নাম নেই। শহরের বুকে এ এক অভিনব দৃশ্য। কংক্রিটের শহরের মাঝে নেমে এসেছে একখন্ড গ্রামবাংলা। যেন টাইম-ট্রাভেলে চড়ে আমরা ফিরে গিয়েছে আজ থেকে একশো বছর আগে। অনেক দর্শককে দেখে মনে হলো তারা অফিস শেষে এসে গানের জালে জড়িয়ে গেছেন। আর উঠতে পারছেন না।

 

রাত তখন বারোটা। সঞ্চালক বাউল হীরক রাজা বললেন, অনেক রাত হয়েছে আমাদের এখন অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। আর মাত্র দুটো গান, এরপরই অনুষ্ঠান শেষ হবে। তারপর আপনাদেরকে সেবা গ্রহণের আমন্ত্রণ। সবাই সেবা নিয়ে তারপর যাবেন।

 

সেবা মানে রাতের খাবার। রাত সাড়ে বারোটায় এত মানুষের সাথে খাওয়া, সেটা আবার খোলা আকাশের নিচে – এ অভিজ্ঞতা মিস করা যাবে না বলে আমিও বসে রইলাম। এদিকে বাসা থেকে ফোন দিচ্ছে। বাবা-মাকে জানিয়ে দিলাম আমার আসতে রাত হবে আপনারা খেয়ে ঘুমিয়ে যান।

 

গান চলল রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত। সবার শেষে হলো –

 

মিলন হবে কতোদিনে
আমার মনের মানুষেরো সনে …

 

দলীয়ভাবে সবাই কণ্ঠ মেলালেন এই গানে।

 

গান শেষে ঘোষণা এলো সবাইকে নিচের পাটিতে এসে বসতে হবে। কারণ সেবা মাটিতে বসে খেতে হবে এটাই নিয়ম। চেয়ারে থাকলে তাকে খাবার দেয়া হবে না। সবাই পাটিতে এসে বসেছেন। বাড়িতে যাবার তাড়া। প্রায় দুইশ’র বেশি মানুষ এখনো আছে। তারা খেয়ে চলে যেতে পারলেই বাঁচে। কখন বাসায় পৌঁছবে কে জানে। কিন্তু এমন সময় একজন বাউল সাইজি ঘোষণা করলেন, খাবার সামনে এলেও কেউ খাবেন না। শেষ ব্যক্তির খাবার পাওয়া নিশ্চিত হওয়ার পর ‘আলেক’ দেয়া হবে। তখন খাওয়া শুরু করবেন। বারবার জোর দিয়ে এই কথা বললেন তিনি। অনেকে খানিকটা বিরক্ত হলো।

 

প্লেটে প্লেটে খাবার দেয়া শুরু হলো। সবাই লাইন করে মুখোমুখি বসেছে। হাত ঘুরে খাবার আসতে বেশ সময় লাগছে। এখনো কিছু লোকের খাবার পেতে বাকি, এমন সময় ঘটল সেই দুর্ঘটনা। এক ব্যক্তি খাওয়া শুরু করে দিয়েছেন এবং সেটা নিয়ে বেঁধে গেল হইচই। বাউলেরা ক্ষেপে উঠলেন। তার কান্ডজ্ঞান নেই এটা সেটা নানাকিছু। বেচারা লজ্জায় কোথায় লুকায় তখন। বাউলেরা তাকে বের হয়ে যেতে বললেন। শেষে পাশের কয়েকজন ভাই তাদের বোঝালেন যে লোকটার মাথায় একটু সমস্যা আছে। অবশেষে বাউলেরা ঠাণ্ডা হলেন। তাদের নিয়মকানুনের কঠোরতা দেখে ভালো লাগল।

 

সবাইকে খাবার দেয়া শেষ হলে একজন বাউল সাইজি জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নিলেন যে সবাই খাবার পেয়েছেন কিনা। এরপর বললেন, সবাই এখন একটা ‘ভক্তি’ দেন। ভক্তি দেয়া বিষয়টা আমার পরিচিত না। দেখলাম উনারা হাত জড়ো করে শরীরটা ঝুকে ভক্তি দেয়া দেখিয়ে দিলেন। তারপর একজন বাউল সাইজি হাত আকাশের দিকে প্রসারিত করে সুর করে বললেন আল্লাহু আলেক। এরকম কিছু কয়েকবার বলার পর সবাই খাওয়ার অনুমতি পেল। সবাইকে বলা হলো খাবার শেষে প্লেট যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট এক জায়গায় ফেলতে।

 

খাবার ছিল সবজি খিচুড়ি। গভীর রাতে খোলা আকশের নিচে এত লোকের সাথে খিচুড়ি প্রকারন্তরে বাউলের সেবা গ্রহণ করে খুব তৃপ্তি পেলাম। কি খাচ্ছি এটা মুখ্য হয়ে দাড়ালো না বরং যে অনন্য অভিজ্ঞতা হলো এটা ফ্রেমে বন্দী করে রাখার মতো। দেখলাম আলেক দেয়ার নিয়ম দেখে প্রথমে যারা উসখুস করছিল, তারাও স্বীকার করলো যে পাবলিক প্রোগ্রামে এতজন মানুষের এমন সুশৃঙ্খলভাবে খাওয়ানো এ শহরে খুব একটা দেখা যায় না। তারা বাউলদের এই নিয়মের প্রশংসা করেই বিদায় নিল।

 

অনুষ্ঠান শেষে আমিও বাড়ি ফিরছি। রাত একটা পার হয়ে গেছে। তবু ফেরার পথে আমার মন আনন্দে ভরপুর। ভেতরে গুনগুণ করে উঠছে লালনেরই একটি গান –

 

আমি কি সন্ধানে যাই সেখানে
আমি কি সন্ধানে যাই সেখানে
আমার মনের মানুষ যেখানে …

 

লালনের গান পরিবেশন করছেন একজন ক্ষুদে বাউল

 

দলীয়ভাবে পরিবেশিত হচ্ছে লালনের গান

 

কুষ্টিয়া থেকে আগত একজন বাউল গান পরিবেশন করছেন

 

Leave a Reply