বিশ্বাস কইরবেন কিনা জানিনা, আমি ভারতে বাইশ বছর ছিলাম। ঐখানে গাড়ি চালাতাম, অন্য কাজ করতাম। ওইখানে রাস্তা পরপর পানি খাওয়ার যায়গা আছে, পোস্রাব করার জায়গা আছে। আর এই দেশে দ্যাখেন কি অবস্থা!  কলকাতায় মালদা-রোডে গাড়ি চালাতাম। ওইখানে বেল দিলিই মানুষ সইরে যাবে। কিন্তু এইখানে বেলের পর বেল দিলিও মানুষ কানে নেয় না। দ্যাখেন না প্রতিদিন এক্সিডেন হচ্চে।

 

কলকাতা গেছিলাম ব্ল্যাকে। আমার ভাইডা মইরা গেলো, সেসময় আসতি পারলাম না। খবর পাইছিলাম সাতে সাতে কিন্তু বাইরের তে চাইলিই তো আসা যায় না।

 

আমার বাড়ি দিনাজপুর। বাড়িত থেকে দশ মিনিট হাটলিই বর্ডারে যাওয়া যায়। তারপরেও ইন্ডিয়ার থেইকি আমার বাংলাদেশই ভালো। এইখানে কামাই কইরা – আমার তো জমিজমা নাই – তিনটা বাচ্চাকাচ্চার লেখাপড়া শিখাইতাছি আর এই কামাই করতিছি এইডা আল্লাপাকের কাছে লাক-শুকুর।

 

নিজের দেশে থাকা, নিজের পরিবারের কাছে এইডা একটা ক্ষমতা আলাদা ।

 

আমার সবাই বাড়িতে থাকে। আমি এইখানে এইযে আজিজ মার্কেট থাকি। আমার একটা বাচ্চা এইবার মনে করেন এই যে সামনে এইটে পরীক্ষা দিবে। আর ছেলে আরেকটা ১২তারিখে আইএ পরীক্ষা দিবে। লেখাপড়ায় ভালো। আমি এখান থেকে একমাস পরপর বাড়ি যাই। ইনকাম করতে তো হইবো। তাছাড়া ভাই সৎ কামাই দিয়ে আমি আমার বাচ্চা-কাচ্চা মানুষ করি। এইজন্য ভারতে ভালো লাগেনা। ওইখানে ইনকাম বেশি একটা হয় না। সিজনওয়ারি কামাই। এই শীতকাল বইছে না! এখন ঐখানে ইনকাম ওইরকম হয় না। আপেল আঙ্গুর ইন্ডিয়ার টানা, ঠ্যালা কয় না – ঐগুলো করতে হয়। আর গরমকালে তখন বাড়ি চইলে আসতাম।

 

বাপ-মা মারা গেছে, সবাই শেষ। বর্তমানে আমি, আরাকটা আমার ভাই বাইচে আছে। ওই ভাই আমাদের দিনাজপুরে অটো রাইস মিল আছে না – ওইখানে কাজ করে। তাছাড়া আমরা এই দুই ভাই; ও মিলে কাজ করে আর আমি রিকশা চালাই। দিন দুইশ টাকা কইরা জমা। তারপর যা থাকে। কামাই, এখন দেশেও অভাব এখানেও অভাব, বুঝতে হবে। আপনার পকেটে যদি দুচাইর টাকা থাকে, তাইলে তো আমাকে আপনি বাড়াই দিয়ে যাইতে পারেন। নিজের অভাব বুঝলে অন্যের অভাব বুঝা যায়।

 

দিনাজপুরে ধানের ই বেশি আর পাট বেশি। পূজার সময় বাড়িতে ছিলাম। তিন ছেলে মেয়ে আমার তিনটাই লেখাপড়া করে। একটা ক্লাস ফাইভে, একটা এইটে পড়ে আর একটা আইএ পড়ে। যে মেয়েটা পরীক্ষা দিল, এইযে আবার নতুন করে ভর্তি করতে আবার টাকা লাগবে। আমি এইযে গাড়ি চালাই, এই দিয়ে তিনডা বাচ্চার খরচ চালাই। আমার ওয়াইফ বাড়িতে তরিতরকারির দোকান করে।

 

আমি আজকে তিনটা চারটা পর্যন্ত চালাবো। রক্তমাংসের শরীর, হিসাবমতো গাড়ী চালাইতে হইব। নাইলে শরীর পড়ে যাইব।

 

 

 

জনাব বিজয়, পেশায় একজন রিকশাচালক

 

 

বিজয় সাহেবের সাথে কথা হলো আজ বাসায় ফেরার পথে। টুকটাক কথার ভেতর দিয়ে আমি মানুষকে জানতে চেষ্টা করি। তার অতীত বর্তমানের খানিকটা ছুঁয়ে দিয়ে দেখতে চাই সে কি নিয়ে বেঁচে আছে। মানুষ কেন বাঁচে? কি তার স্বপ্ন? এই জীবনকে সে কিভাবে দ্যাখে? বিজয় সাহেবের ক্ষেত্রে কিছুটা জানা গেল। এরকম প্রচেষ্টা অব্যহত থাকবে এবং এগুলো লিপিবদ্ধ থাকবে তাদের নিজেদের জবানিতে। 

 

Leave a Reply