সরিষা ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে মাসুমকে বললাম, ফালতু শহরে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে না। আজ ধামরাই, কাল সিলেট, পরশু খুলনা, পরেরদিন আবার অন্য কোনো যায়গা। এমন হলে কতো দারুণ হতো। প্রতিদিন ভোর হবে এক নতুন জায়গাতে, এই না হলে আর জীবন।

 

রানা ভাইয়ের সাথে রবিবার রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলাম। যদিও এই যায়গা যে আমার খুব পছন্দ এমন নয়। তবে এখানে আসার উদ্দেশ্য হলো পরদিন সকালে পাখি দেখা ও ছবি তোলা।

 

ক্যাম্পাসে পৌঁছেই শুনি আমার বন্ধু মাসুমও এসেছে। মাসুমকে সাথে নিয়ে বটতলায় রাতের খাবার খেয়ে বঙ্গবন্ধু হলের ৪০৩ নাম্বার রুমে উঠলাম আমরা। এখানে রানা ভাইয়ের প্রাক্তন ছাত্ররা থাকে। ওরা আমাদের জন্য খিচুড়ি রান্না করলো। আগেই রাতের খাবার খেয়েছি বলে আমি আর মাসুম অল্প একটু খেলাম ওদের খুশি করতে।

 

পরদিন সকালে রানা ভাইকে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলতেই রানা ভাই বললেন যে তার শরীর খারাপ। গতরাতে বাসে উঠতে যেয়ে কোথায় কোন রগে টান খেয়ে এখন অবস্থা বেগতিক। প্রচণ্ড ব্যাকপেইন নিয়ে বেচারা বিছানায় চিৎপটাং।

 

অগত্যা রানা ভাইকে রেখে সকাল সকাল আমি বেরিয়ে পড়লাম। মাসুম অবশ্য আরেকটু আগে বেরিয়েছে ওর এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে।

 

রাস্তায় হাঁটছি। পাখির কিচিরমিচির শুনলেই দাঁড়াচ্ছি, কখনো কখনো ক্লিক করছি ক্যামেরায়। নির্জন লেক বা জংগলমতো যায়গায় শব্দ শুনলেই সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি পাখিকে ক্যামেরাবন্দী করতে। ঠিক এমন সময় ঘটলো এক মজার ঘটনা।

 

আমি হাতের বামে একটা লেক মতো যায়গা দেখে ছবি তোলার জন্য এগিয়ে গেলাম। ওখানে বেশ অনেক পরিযায়ী পাখি ওড়াউড়ি করছে। একটা ঝোপঝাড় পেরিয়ে খুব সাবধানে সামনে এগোচ্ছি, কারণ শব্দ পেলেই পাখি সব অন্য জায়গায় চলে যাবে, ছবি তোলা যাবে না। এমন সময় হঠাৎ কানে এলো মানুষের কথা বলার শব্দ। এত সকালে এখানে কে আসবে এমন ভেবে সামনে তাকাতেই দেখি দুজন ছেলেমেয়ে গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে প্রেমের ক্লাস করছে। নানান কিসিমের প্রেমিক-প্রেমিকা দেখেছি, কিন্তু এরকম সকালবেলা গাছে ঝুলে ঝুলে প্রেম করা জুটি আগে কখনো দেখি নাই।

 

যাহোক, এরপর ক্যাম্পাসে টুকটাক দু’একটা ছবি তুলে, আর পুকুরভর্তি অতিথি পাখির নামে কয়েক ব্যাটালিয়ান খাকি-ক্যাম্পবেল পাতিহাঁস (!) দেখে বিরক্ত হয়ে মাসুমকে বললাম, চল, আশপাশের কোনো গ্রাম থেকে ঘুরে আসি।

 

মাসুম এক কথায় রাজি হয়ে গেল।

 

আমরা বিশ্ববিদ্যালয় গেইট থেকে বাসে করে প্রথমে নবীনগর। তারপর নবীনগর থেকে চেতনাধারী বাঙালীর ভীড় ঠেলে অনেকটা পথ হেঁটে গিয়ে আবার একটা গাড়িতে করে গেলাম ধামরাই।

 

ধামরাই নেমে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর একটা রিকশা নিয়ে শরিফবাগ গ্রামে চলে গেলাম সরিষাক্ষেত দেখতে।

 

বিস্তীর্ণ সরিষাক্ষেতের মাঝখানের সরু আইল ধরে হাঁটছি। কখনো বক, কখনো পানকৌড়ি কিংবা মাছরাঙা যেটা সামনে পাচ্ছি ছবি তোলার চেষ্টা করছি। অনেকদূর হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হলে ঘাসের উপর শুয়ে থেকে বিশ্রাম নিচ্ছি।

 

ক্ষেতের মাঝ দিয়ে অনেকগুলো ছোটো ছোটো পুকুর আছে। সেখানে পাখি এসে বসছে, আবার উড়ে যাচ্ছে। পানকৌড়ি ডুব দিয়ে নিখোঁজ, আবার হঠাৎ করে মাছ মুখে নিয়ে ভেসে উঠছে। মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে আদিগন্ত বিস্তৃত সরিষাফুল। যেন হলুদের রাজধানীতে এসে পড়েছি আমরা।

 

এভাবে সবুজ-হলুদ প্রান্তরে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতি পথের গাড়িতে উঠলাম।

 

যথারীতি নবীনগরের আগে আবারো প্রচণ্ড জ্যাম। বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে এসে রাস্তাঘাটের প্রায় অচলাবস্থা। এত বেশি চেতনা যে জাতির, সে জাতির দেশের এই বেহাল দশা যে কেন – এটা আমি কিছুতেই ভেবে পাই না।

 

যাহোক, জাবিতে এসে শুনলাম রানাভাই আজ ফিরবেন না। তার ব্যথা কমেনি, আজ রাতে তাই এখানেই রেস্ট নেবেন।

 

কি আর করা, আমি আর মাসুম রানা ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর বটতলায় হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে, তাইরে নাইরে করতে করতে ফিরে এলাম ঢাকায়।

 

কাল থেকে আবার ছকে বাঁধা জীবন।

 

উড়ে যায় সুন্দর

 

লাল শাপলার হাসি

 

জলাশয়ে জলটিটি

 

পুকুর ভর্তি হাসিমুখ

 

ওখানে কে রে ?

 

পরিযায়ী পাখির দল

 

জলের রঙে জলছবি

 

জলাশয় ও পাখি

 

ধানের চাতালে কবুতরের মিছিল

 

আকাশচারী

 

কর্মঠ মানুষ

 

কাজের শিল্প

 

ধামরাইয়ের সরিষা ক্ষেত

 

যুগলবন্দী – পানকৌড়ি ও ফিঙে

 

মাছরাঙা ও প্রকৃতি

 

ধ্যানী পানকৌড়ি

 

সাদা বক

 

কসাই পাখি

 

ধামরাইয়ের সরিষাক্ষেত

 

উড়ে যায় সুন্দর

 

প্রকৃতির শিশুরা

 

মুগ্ধ বালক আর কিছু নাহি চাহে / ভালোবাসা তার দিগন্তজোড়া হলুদ মাঠে মাঠে

 

কিভাবে যাবেন? 

ঢাকার গাবতলী থেকে আরিচাগামী যেকোনো বাসে উঠে ঢুলিভিটা বাসস্ট্যান্ড নেমে যান। তারপর ওখান থেকে রিকশা করে ধামরাই বাজার। মোট সময় লাগবে দেড় থেকে দুই ঘন্টা। খরচ হবে ৭০ থেকে ১০০ টাকা।

সরিষা ফুল দেখার উপযুক্ত সময় শীতকাল। হিম হিম বাতাসে হলুদ-সোনালি প্রান্তরে খালি পায়ে হেঁটে আসুন কোনো একদিন।

 

যেখানেই যান, পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না। 

Leave a Reply