Jung Ha Lee বললেন, উই আর অফারিং ইউ দ্যা জব।
তার কথা শুনে আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম।

 

চাকরিতে এপ্লাই করতে আমার রাজ্যের অনীহা। এ পর্যন্ত আমাকে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি চাকরি পাবার জন্য। অনার্স শেষ করে কিছুদিনের মধ্যেই চাকরি পেয়েছিলাম। এক বড় ভাই আমাকে রেকমেন্ড করেছিলেন, আমার তেমন কৃতিত্ব নেই। সেখানে বছর দেড়েক চাকরি করার পর আমার বর্তমান কর্মস্থল ডেইলি স্টারে যোগ দিই। সুতরাং চাকরি না থাকার কষ্ট বা হতাশার সাথে আমার পরিচয় নেই। এদিক থেকে নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবানই বলতে হবে।

 

মাস দুয়েক আগে আমার ডিপার্টমেন্টের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সঞ্জয় দা এশিয়ান পেইন্টস-এ চাকরি পেয়ে গেলেন। তখন সঞ্জয় দা চলে যাওয়ার শোকে আমি দুয়েকটা চাকরিতে এপ্লাই করে কিছুদিন পর যথারীতি তা ভুলেও গিয়েছিলাম। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন ফোনে টেক্সট এলো Heart to Heart Foundation থেকে। নভেম্বরের ২৫ তারিখ দুপুর ৩টার সময় একটা ইন্টার্ভিউ এর জন্য লিখেছে। প্রথমে বেশ অবাক হলাম। তারপর দেখলাম যে বিডিজবস-এ কিছুদিন আগে Heart to Heart Foundation ও KOICA (Korea International Cooperation Agency) এর একটা যৌথ প্রজেক্টে এপ্লাই করেছিলাম ।

 

যাহোক, ২৫ নভেম্বর গেলাম তাদের অফিসে, বসুন্ধরার সি ব্লকে। গিয়ে দেখলাম আমার মতো আরও প্রায় পনেরজন এসেছেন ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য। গ্রুপ ইন্টারভিউ হচ্ছে। একসাথে তিনজন করে ভেতরে যাচ্ছে। ইন্টারভিউ নিচ্ছে দুজন কোরিয়ান; একজন কোরিয়ান ভদ্রলোক যার নাম ভুলে গেছি, আরেকজন ভদ্রমহিলা যার নাম Jung Ha Lee। তখনো জানি না যে এই ভদ্রমহিলার সাথে আমার আরও একবার দেখা হবে এবং তিনি আমাকে বলবেন, উই আর অফারিং ইউ দ্যা জব। এবং আমি এতে করে আনন্দিত হওয়ার বদলে খানিকটা দ্বিধান্বিত হবো।

 

যথারীতি আমার ইন্টারভিউ-এর সময় হলো। আমার সাথে আরও দুইজন, মোট আমরা তিনজন ভেতরে ঢুকে বসলাম। এটা ওটা অনেক প্রশ্ন করা হলো আমাদের প্রত্যেককে পর্যায়ক্রমে। আমাকে Lee জিজ্ঞেস করলেন আমি তো পত্রিকায় কাজ করি, কেন আমি এই প্রজেক্টে কাজ করতে আগ্রহী? কোন দিকটাকে আমি আমার স্ট্রেন্থ হিসেবে মনে করি? এদেশে একটা প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশানের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জিং দিকগুলো কি কি? এরকম আরো কিছু প্রশ্ন। ভদ্রলোক যিনি ছিলেন উনি দারুণ বাংলা জানেন, সবাইকে বুঝিয়ে বললেন কি কাজ, কি কি সুবিধা আর কি কি সমস্যা হতে পারে ইত্যাদি সাতসতের। দুজনের আন্তরিকতা ও হাসিমুখের কারণে ইন্টারভিউ এর সময়টা ভালো কাটলো।

 

ইন্টারভিউ সেশন শেষ করে বের হয়ে শুনি আধাঘন্টার একটা রিটেন-টেস্ট হবে। কি আর করা। বসে গেলাম ল্যাপটপের সামনে। একটা লেটার, একটা ক্যাম্পেইন এক্টিভিটি ডিজাইন, আর একটা কি যেন ছিলো ভুলে গেছি। যাহোক, পাঁচ মিনিট বাকি থাকতেই রিটেন শেষ করে ফেললাম। আমার অবশ্য ভীষণ তাড়া ছিল। এদিকে আমার PGDHRM -এর সেমিস্টার ফাইনাল চলছে, সাড়ে সাতটায় এক্সাম। রিটেন শেষ করে সাথে সাথেই বের হয়ে গেলাম ধানমন্ডি ২৭-এ বিআইএম-এর উদ্দেশ্যে।

 

তারপর অবশ্য নানান ব্যস্ততায় ভুলেই গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আরো অনেক এপ্লিকেন্টস ছিলো যাদের অনেক বছরের অভিজ্ঞতা আছে, ওদের কাউকেই হয়তো সিলেক্ট করবে। কিন্তু ঘটনা ঘটলো অন্যরকম।

 

৩০ নভেম্বর অফিসে যাব, জাহাঙ্গীর গেইটে দাঁড়িয়ে আছি বাসের জন্য। এমন সময় Lee-র ফোন। আমি আরেকবার তার অফিসে আসতে পারবো কিনা জানতে চেয়েছেন। আমি বললাম যে, আগামীকাল যেতে পারবো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো পরদিন যেতে পারলাম না শারীরিক অসুস্থতার কারণে। শেষমেশ ডিসেম্বরের ২ তারিখ সাড়ে পাঁচটায় যাব, জানিয়ে দিলাম।

 

রাস্তায় জ্যাম না থাকায় পাঁচটায় পৌঁছে গেলাম Lee-র অফিসে। দেখলাম শুধুমাত্র আমাকেই ডাকা হয়েছে। Lee আমাকে জিজ্ঞেস করলেন চা কফি কিছু খাবো কি না। আমি জানালাম, থ্যাঙ্কিউ, জাস্ট এ গ্লাস অফ ওয়াটার, নাথিং এলস।

 

তারপর শুরু হলো আসল কথা। Heart to Heart Foundation ও KOICA-র এই প্রজেক্টটা সম্পর্কে। অফিস হবে সাভারের জিরানি বাজার। অফিস টাইম ৯টা থেকে ৫টা। আমি জিজ্ঞেস করে জানলাম সাপ্তাহিক ছুটি মাত্র একদিন। শুনে মন খারাপ হলো। ঢাকা থেকে যদি অফিস করি তাহলে পিক-এন্ড-ড্রপ সার্ভিস পাব কিনা এটা জিজ্ঞেস করাতে উনি বললেন যে উনারা এটা এখনই বলতে পারছেন না। তবে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

 

রিপোর্টিং বস, জব ডেস্ক্রিপশন, অফিস টাইমিং, লিভ পলিসি, ইত্যাদি নানান কথার মধ্যে একসময় Lee বললেন, উই আর অফারিং ইউ দ্য জব। উই ডিড নট কন্টাক্ট আদার ক্যান্ডিডেট ইয়েট। সো, ইউ হ্যাভ টু টেক ইউর ডিসিশান এজ আর্লি এজ পসিবল।

 

আমি Lee কে বললাম, বর্তমান কর্মস্থলে আমি বেশ ভালো আছি। এখানে সপ্তাহে দেড় দিন ছুটি। বাসার সামনে থেকে বাসে উঠলে একদম অফিসের পাশে নামিয়ে দেয়। আমার কাজও আমি এনজয় করি। এভরিথিং ইজ গোয়িং ভেরি ওয়েল। জানালাম যে শুধুমাত্র এনজিওতে কাজ করার আগ্রহ থেকেই এই জবে এপ্লাই করা। সুতরাং আমার কিছুটা সময় লাগবে সিদ্ধান্ত জানাতে।

 

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে সে কতদিন ধরে বাংলাদেশে কাজ করছে। Lee নিজের জীবনের অনেক কথা বললেন। বাংলাদেশে তার বছর দুয়েক হলো। উনি এর আগে ফিলিপাইনে কাজ করেছেন। তার আগে ছিলেন কেনিয়াতে। তিনি বললেন যে KOICAতে জয়েন করা আমার জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে, যেমনটা তার জীবনেও হয়েছে।

 

আমি সময় চাইলে Lee বললেন যে উনি আসলে বেশি সময় আমাকে দিতে পারবেন না। কারণ জানুয়ারি থেকে তাদের প্রজেক্ট স্টার্ট হবে। তাদের হাতেও খুব একটা সময় নেই। আমি বললাম, ঠিকাছে। আমি আগামীকাল সন্ধার মধ্যে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব।

 

Lee-র সাথে আরো অনেক কথা হলো। আসলে কথায় কথায় – আমার যা স্বভাব – আমি মানুষটাকে জানতে চেষ্টা করি। যদিও এত অল্প সময়ে কাউকে তো আর জানা যায় না। তবুও ভিন্ন দেশে ভিন্ন কালচারে বেড়ে ওঠা একটা মানুষ কিভাবে জীবনকে দ্যাখে এটা জানার ইচ্ছা আমার মধ্যে প্রবল। একবার অবশ্য মনে হচ্ছিল, হ্যাঁ বলে দিই। কোরিয়ানদের সাথে কাজ করার একটা এক্সপেরিয়েন্স নিয়েই দেখি কি হয়।

 

রাতে বাসায় বললাম যে চাকরিটা পেয়ে গেছি কিন্তু করবো কিনা বুঝতে পারছি না। আব্বু যথারীতি জিজ্ঞেস করলেন স্যালারি কত দিবে। বললাম, এখনকার চেয়ে হাজার সাতেক বেশি কিন্তু অফিস হবে সাভারের জিরানি বাজার। আব্বু মাথা নেড়ে বললেন, দরকার নাই। এখানে আছো, এখানেই থাকো কিছুদিন।

 

আম্মু বললেন, দরকার নাই তোর এত দূরে চাকরি করার। বাসায় থেকে যাতায়াত করলেও আসতে অনেক রাত হবে। রাতে সবাই মিলে খেতে বসে কতো গল্প করি সেটা আর হবে না। তার চেয়ে ডেইলি স্টারেই থাক।

 

পরদিন সকালে সবুজ ভাইকে ফোন দিলাম। উনার সাথে ইন্টারভিউ দিতে যেয়ে পরিচিত হয়েছিলাম। উনি ওখানেই জব করেন অনেক বছর। আমি তার কাছ থেকে বিস্তারিত আরও অনেক তথ্য নিলাম। অফিসে আমার বসের সাথেও বিষয়টা জানালাম। বস বললেন, দ্যাখো তুমি যেটা ভালো মনে করো সেটাই করো তবে আমার মনে হয়, শুধুমাত্র দুঃস্থ মানুষের জন্য কাজ করতে যাওয়ার গ্রাউন্ড ছাড়া অন্য কোনোদিক থেকেই তোমার ওখানে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। খুব ভালো কোথাও হলে আমি নিজেই তোমাকে উৎসাহ দিতাম।

 

কোনো সিদ্ধান্ত নিতে আমি এত বেশি কখনো ভাবি না। তবে এটা নিয়ে এত ভাবনা-চিন্তা করার কিছু কারণ ছিল। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স করেই ঢাকা চলে আসি। মার্স্টার্স ইংরেজিতে না করে ভর্তি হই ডেভলপমেন্ট স্টাডিজে। উদ্দেশ্য ছিলো ভালো কোনো এনজিওতে চাকরি করবো। এক্ষেত্রে দুটো লাভ হবে – নানান মানুষের সাথে মিশে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা হবে এবং বেশ ভালো টাকা স্যালারি পাবো।

 

কিন্তু ঢাকা এসে মাস্টার্স চলাকালীন সময়েই আমি চাকরীতে ঢুকে পড়ি একটা এডফার্মে, নাম ওয়াটারমার্ক এমসিএল। অনেককিছু শিখেছি প্রথম চাকরিটা থেকে। নানান ধরণের কাজের সাথে পরিচিত হয়েছি। ওয়াটারমার্কেরই একটা এনজিও আছে ‘গ্রিন বাংলাদেশ’ নামে। আমি সেটার প্রজেক্টের কাজও করতাম। গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এক্সট্রা-কারিকুলার এক্টিভিটিজ দেখাশোনা করতাম, স্কলারশিপ দিতাম। প্রতিমাসে একবার করে গাইবান্ধা ও রংপুর যেতে হতো। সেটাও এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। তারপর তো ডেইলি স্টারের এডমিনিস্ট্রেশনে চলে এলাম। এনজিওতে কাজ করার প্রতি যে একটা দূর্বলতা আছে আমার, মূলত এ কারনেই সিদ্ধান্ত নিতে এতকিছু ভাবলাম।

 

যাহোক, বেশ ভেবে চিন্তেই ঠিক করলাম যে চাকরিটা আমি করবো না। ঢাকা থেকে জিরানি বাজার অফিস করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আর তাছাড়া ওখানে যেয়ে থাকলে আমার যে অফিসের বাইরে একটা জীবন আছে, সেটা নষ্ট হবে। মন চাইলেই নাটক দেখা, কিংবা এদিক ওদিক ছুটে যাওয়া কোনো কিছুই হবে না। তাছাড়া আমি বর্তমান নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ। ভবিষ্যতের ভাবনা বেশি ভাবতে পারি না। আমার কাছে মানুষের ভবিষ্যৎ একটাই – তা হলো, মৃত্যুতে বিলীন হয়ে যাওয়া।

 

তাই অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম ডেইলি স্টারেই থাকবো আরো কিছুদিন। যখন দেখবো সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না কিংবা আর পোষাচ্ছে না এখানে, তখন না হয় কেটে পড়া যাবে অন্য কোথাও।

Leave a Reply