ইন্ডিয়া থেকে ফিরেছি গতকাল। ইন্ডিগো এয়ার লাইনসের বিকেল ৪টা ১০ এর ফ্লাইটে মাত্র ৩০ মিনিটে ঢাকা এসে পৌঁছুলাম। করোনা ভাইরাস ইস্যুতে ১১ মার্চ থেকে ইন্ডিয়ার সব ট্যুরিস্ট প্লেস সরকারি নির্দেশে বন্ধ হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ান ভিসা সাসপেন্ড করা হয়েছে। হোটেলগুলোতে কোনো বিদেশিকে রুম দেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশে যারা ফেরত আসছে তাদেরকে সন্দেহজনক মনে হলে রাখা হচ্ছে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে, আশকোনার হাজিক্যাম্পে কিংবা গাজীপুরে। সবমিলিয়ে এক উদ্ভট এবং আতঙ্কিত একটা সময়ের মধ্য দিয়ে এবারের ভ্রমণ সম্পন্ন হলো।

 

১০ দিনের এই সাউথ ইন্ডিয়া ভ্রমণ কেমন ছিল তা এখনো বুঝে উঠতে পারছি না। মনে হচ্ছে দিনগুলো স্বপ্নের মতো কেটে গেছে। সেই স্বপ্নের আবছা যতটুকু স্মৃতিতে আছে, তা লিপিবদ্ধ করে রাখতে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছি। কেমন কাটলো ৫মার্চ সন্ধ্যা থেকে ১৫ মার্চ সন্ধ্যা পর্যন্ত দেখা যাক টাইম ট্রাভেল করে।

 

এবারের সলো ট্যুরে যে সব জায়গাতে যাওয়া হলো –

১. ফোর্ট কোচি

২. মুন্নার

৩. কাট্টাপ্পানা

৪. কুমিলি, থেক্কাডি

৫. কুমারাকুম

৬. মারিনা বিচ, চেন্নাই

 

প্রত্যেকটি যায়গা নিয়ে একটি করে পোস্ট দেয়া যাক। এতে করে জায়গাটা নিয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে। আজকের পোস্টটা ফোর্ট কোচি নিয়ে।

 

 

১. ফোর্ট কোচি

 

ঢাকা থেকে মার্চের ৫ তারিখ বিকেল ৫টা ২০-এ নভো এয়ারে করে কলকাতা যেয়ে পৌঁছুলাম। ফ্লাইট ডিলে হওয়ার কারণে কলকাতায় পৌছুতে রাত হয়ে গেল। পরদিন দুপুরে কলকাতা টু কোচি-র ফ্লাইট। সুতরাং রাতটা থাকবার মতো হোটেল খুঁজে বের করতে হবে। গুগল ম্যাপের সহযোগিতা নিয়ে হাঁটাবাবার মতো রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। কলকাতার রাস্তাঘাটে ঢাকার ব্যস্ততা। প্রচুর ট্রাফিক, হর্ণ, মানুষের ছোটাছুটি। কলকাতাকে আমার ঢাকার এক্সটেনশন মনে হলো। অনেক খুঁজে একটা হোটেলে উঠলাম। ভাড়া ১১০০ রুপি। রাতটা কাটিয়ে পরদিন ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের একটা ফ্লাইটে রওনা দিলাম কোচি-র উদ্দেশ্যে। ব্যাঙ্গালুরে ৪০মিনিটের ট্রানজিট শেষে কোচিতে যেয়ে পৌঁছুলাম রাত ৮টার দিকে। প্লেন জার্নি আমার খুব পছন্দের। অল্প সময়ের মধ্যে দূরদূরান্তে পৌছানো যায়। কোচিতে রাতটা কাটাবার জন্য হোটেলে উঠলাম। কোচি ছোট্ট শহর। এখানকার কোচিন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টটি সম্পূর্ণভাবে সোলার পাওয়ার ব্যবহার করে চালানো হয়।

 

পরদিন সকালে কোচির আংগামালি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠে গেলাম থোপ্পামপাডি। সেখান থেকে ফোর্ট কোচি। কোচি থেকে ফোর্ট কোচির দূরত্ব প্রায় ৪৫কিলোমিটার। ফোর্ট কোচির একটা ফাস্টফুডের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে যখন পেটিসমতো কি যেন খাচ্ছি তখন দুপুর ১২টার কিছু বেশি। প্রচণ্ড রোদে ঝলমল করছে চারপাশ। প্রথম যে বিষয়টা চোখে লেগেছে সেটা হলো ফোর্ট কোচির বাড়িঘরগুলো। খুব সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের ডুপ্লেক্স বাড়ি। পরে অবশ্য সমগ্র কেরালা জুড়েই দেখেছি এরা বাড়ির ব্যাপারে খুব সৌখিন। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে অপরূপ সুন্দর চোখ ধাঁধানো সব বাড়ি। বাড়ির সামনে ফুলের গাছ আর চারপাশে প্রহরীর মতো ঘিরে আছে নারিকেল গাছ। মন ভরে যায় কেরালার বাড়িঘর দেখলে।

 

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে ফোর্ট কোচি মূলত ছিলো কেরালার একটা ফিশিং ভিলেজ। ফোর্ট কোচিতে বহু দেশের বহু পর্যটক প্রতিদিন রাখছেন তাদের পদচিহ্ন। এর যতটা না এখানকার স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার জন্য, তারচেয়ে অনেক বেশি ফোর্ট কোচির সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য। এ ছোট্ট ফিশিং ভিলেজটিতে ১৫০৩ সালে পর্তুগিজরা ঘাঁটি গড়ে তোলে।  ১৫১৬ সালে তারা স্থাপন করে সেইন্ট ফ্রান্সিস চার্চ। অবশ্য তাদের গড়ে তোলা ঘাঁটি ফোর্ট ইমানুয়েল পরবর্তীতে ডাচরা ধ্বংস করে ১৬৮৩ সালের দিকে। ফোর্ট কোচি পর্তুগিজদের অধীনে ছিলো ১৬০ বছর। অতঃপর ডাচরা ১৬৮৩ সালে ফোর্ট কোচি অধিকার করে এবং নানাবিধ পর্তুগিজ স্থাপনা ধ্বংস করে। যা হয় আর কি! বাংলাদেশ যেমন শেখ হাসিনা আসলে খালেদা জিয়ার সময়ে করা স্থাপনার নামকরণ বদলে দেয়, আবার খালেদা আসলে হাসিনার তেমনি। পৃথিবীর ইতিহাসই এরকম। ধ্বংসের ইতিহাস, এলোমেলো করে দেয়ার ইতিহাস। মানুষ শান্তিতে থাকতে ভালোবাসে না। সবসময় তার অশান্তি আর এক্সাইটমেন্ট চাই। যাহোক, ১৭৯৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১১২বছর ফোর্ট কোচি ডাচদের অধিকারে ছিল। তারপর ময়দানে খেলা করতে আসিলো বৃটিশ ভাইয়েরা। তাদের হাত থেকে পৃথিবীর কোনো জায়গার নিস্তার নাই। ১৭৯৫ সালে ডাচদের খেদিয়ে বৃটিশরা ফোর্ট কোচির দখল নেয় এবং ১৯৪৭ সালে ইন্ডিয়ার স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ফোর্ট কোচি বৃটিশদের দখলেই ছিল।

 

কিন্তু এইসব তথাকথিত দখলদারিরও অনেক আগে থেকে ফোর্ট কোচি ছিলো আরব ও চাইনিজ ব্যবসায়ীদের স্বর্গরাজ্য। তারা এখান থেকে নানাবিধ মসলা, সুগন্ধি, ইত্যাদি সংগ্রহ করে তা ইউরোপে রপ্তানি করতো। কোচিন নামটার অর্থও তেমনটাই সাক্ষ্য দেয়। কো-চিন/কোচি মানে হলো চাইনার মতো।

 

যাহোক, আমি খুব একটা ইতিহাস-পাতিহাস সচেতন ব্যক্তি না। ফোর্ট কোচিতে নেমে বুকিং ডট কমে একটা হোটেল বুকিং দিলাম। কিন্তু হোটেলে না গিয়ে প্রথমে গেলাম সান্তা ক্রুজ ক্যাথিড্রাল ব্যাসিলিকাতে। দুপুরের রোদে একদম ঝলমল করছে এই পর্তুগিজ স্থাপনাটি। পাশের একটা ভবনে দেখলাম বহুলোকের খাবারের আয়োজন হয়েছে। একবার মনে হলো আমিও প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে যাই। কিন্তু কি যেন ভেবে আবার নিজেকে বিরত রাখলাম। কেরালার খাবারের স্বাদ সহ্য করতে পারবো কিনা এ বিষয়ে বিস্তর সন্দেহ ছিলো। এজন্যই সেখান থেকে বের হয়ে গেলাম সমুদ্রের হাওয়া খেতে। ফোর্ট কোচির বিখ্যাত চাইনিজ ফিশিং নেট আর সি-বিচ দেখতে।

 

ফোর্ট কোচি বিচে বহুদেশের বহু মানুষের ভিড়। সাদা-কালো-বাদামী মিলিয়ে এই দুপুর রোদেও বিচ জমজমাট। চাইনিজ নেটে মাছ ধরার কৌশল দেখে মুগ্ধ হলাম। আর সাথে সাথে হতাশও হলাম এটা দেখে যে ফোর্ট কোচির মানুষেরা মোটেও পরিবেশ সচেতন নয়। সমুদ্রের পানিতে ভেসে আসছে প্ল্যাস্টিক বোতলসহ নানাবিধ আবর্জনা। এগুলো নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হলো না। অনেকে হাতজাল দিয়ে মাছ ধরছে। দু-তিনটা ডলফিনকে দেখলাম ডুবসাতার দিতে। ডলফিন দেখে মন ভালো হয়ে গেল। যারা হাতজাল দিয়ে মাছ ধরছে তারাও অনেক মাছ পাচ্ছে। নানান ধরণের মাছ। এগুলো আবার ওখানেই বিক্রির জন্য দোকানে রাখা হচ্ছে। মৎস্যপ্রেমীদের জন্য আদর্শ যায়গা বলতে হবে। আমি মাছের ব্যাপারে অতোটা উৎসাহী নই। খাওয়ার মধ্যে শুধু ইলিশ মাছটাই ভালোবাসি।

 

যাহোক অনেকটা সময় কাটিয়ে বিচ রোডের পাশ থেকে আনারস আর আমের সালাদ খেয়ে হোটেলে উঠলাম। হোটেলের নাম শান্তা মারিয়া হোটেল। ইচ্ছা করেই ডরমিটরিতে উঠলাম। যেখানে আমার রুমে আছে আরও তিনজন। তার ভেতর এক বৃটিশ নাগরিকও আছে এবং তার সাথে কিছুটা সখ্য হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী দিন আমি এরনাকুলামে থাকার প্ল্যান বাদ দিয়ে মুন্নারের উদ্দেশ্যে রওনা দেব।

 

যাহোক, দুপুরে গোসল সেরে ফোর্ট কোচির প্রচণ্ড গরমে আবারো বাইরে বের হলাম। ইচ্ছা ছিলো কোচি মিউজিয়াম দেখার। কিন্তু ভুলভাল গুগল ম্যাপের চক্করে পড়ে তা কি আর হবার জো আছে ! উল্টোপাল্টা পথে ঘুরে ট্যুরে এসে পরে সন্ধ্যার সময় দেখি, আরে ! এ যায়গা তো আমার হোটেলের পাশেই ছিল। যাহোক, অনেক হাঁটলাম সারা বিকেল। জিউটাউন রোডে দেখলাম উইন্ডো শপগুলোতে নানান মসলা, ফ্লাওয়ার ওয়েল, উড ওয়েল এর পসরা। কোনো কোনো দোকানে আবার ট্র্যাডিশনাল ক্লোথিং, শো-পিস ইত্যাদি। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম মাট্টানচেরি প্যালেস, কেরালা কাত্থাকালি সেন্টার, নেভাল মেরিটাইম মিউজিয়াম রোড। তারপর আবারো ফোর্ট কোচি বিচ।

 

রাতের বেলা ফোর্ট কোচি বিচটা বেশি সুন্দর লাগে। বড় বড় ঢেউ এসে রিনিঝিনি শব্দে বাড়ি খায় উপকূলে। নিস্তব্ধ রাতে সমুদ্রের মনমাতানো মিউজিক এক অনিন্দ্যসুন্দর অনুভূতি এনে দেয়।  উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ঢেউ, বাতাসে সেই শো শো শব্দ। তারপর একসময় পাথরে আছড়ে পড়ছে তা। পানির ছোট ছোট কণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকক্ষণ ধরে উপভোগ করলাম প্রকৃতির এই রূপ।

 

সান্তা ক্রুজ ক্যাথিড্রাল ব্যাসিলিকা

 

 

চাইনিজ ফিশিং নেট

 

 

সামুদ্রিক মাছ বিক্রির আয়োজন

 

 

মাট্টানচেরি প্যালেস মিউজিয়াম

 

 

জিউ টাউন

 

 

জিউ টাউনের সুগন্ধি, ফ্লাওয়ার ওয়েল, উড ওয়েল, এবং স্যুভেনিরের দোকান

 

 

মহাত্মা গান্ধী বিচ, ফোর্ট কোচি

 

 

ফোর্ট কোচির একটি বাড়ির সামনের ফুলগাছ

 

 

Leave a Reply