*কেরালায় বাবাকে কোলে নিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরলেন ছেলে

*করোনা সন্দেহে মাকে সখীপুরের বনে ফেলে গেলেন সন্তানেরা

 

*সারাবিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছে

*একদিনে দেশে রেকর্ড মৃত্যু ১০ জনের, রেকর্ড আক্রান্ত ৩৪১

*ময়মনসিংহে করোনাভাইরাসে কৃষকের মৃত্যু

 

*চট্টগ্রামে ১৮টি গার্মেন্টসসহ চালু রয়েছে ১০৮টি কারখানা; ঝুঁকিতে কয়েক লাখ শ্রমিক

*শ্রমিকের মজুরি দেয়নি দুই হাজার কারখানা

 

*স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি ছাড়তে বললে আইনি ব্যবস্থা: দুদক চেয়ারম্যান

*আরও ৫০ লাখ মানুষকে রেশন কার্ড দেব: প্রধানমন্ত্রী

 

*খাটের নিচে তেলের খনি!

*গরিবের খাদ্য চুরি: কারও কারাদণ্ড, কেউ বহিষ্কার

*বাড়ি থেকে ১৮৪ বস্তা চাল উদ্ধার, চেয়ারম্যান আ’লীগ নেতা পলাতক

 

*দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে জাপান: বিবিসি

*যুক্তরাজ্যে অন্তত আরও তিন সপ্তাহ লকডাউন থাকবে। বিবিসি

 

*বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অর্থ সহায়তা দেওয়া বন্ধ করল যুক্তরাষ্ট্র

*করোনা আক্রান্ত ইতালিতে অসহায়দের খাবার দিচ্ছে দুর্ধর্ষ মাফিয়ারা

 

*করোনা নিয়ে প্রথম সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায়

*করোনার মেঘে ঢাকা বলিউড, ঈদে আসছে না সালমান-অক্ষয়ের ছবি

 

 

১৭ই এপ্রিল, ২০২০ সালের পৃথিবী। উপরের লাইনগুলো আজকের পত্রিকার কয়েকটি শিরোনাম। কতটুকু এগিয়েছে পৃথিবী কিছু কি অনুমান করা যায়?

 

যে লেখাটা লিখবো বলে বসেছি, জানিনা শেষমেশ তা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। মানুষ সম্পর্কে হতাশার যে গভীর সমুদ্রে ভাসি, সেখান থেকে কোনো লাইটহাইজ কি কোনোদিনও দেখাবে আশাবাদের পথ? জানিনা। খবরের কাগজে চোখ রাখলে নিজেকে আরও বিভ্রান্ত লাগে। রাগ হয়। মনে হয় – যাক, সব মরে যাক। আবার নতুন করে তৈরি হোক পৃথিবী। আমি বা আমরা কেউ না থাকলেও ক্ষতি নেই। প্রকৃতির দখলে যাক সবকিছু।

 

তৃতীয় বিশ্বের এক উদ্ভট দেশে জন্মেছি বলেই এত ক্ষোভ কিনা কে জানে!

 

 

করোনাভাইরাস : বাংলাদেশ ও বিশ্ব  

 

মার্চের ২৫ তারিখ থেকে সারাদেশে চলছে লকডাউন। সব সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ। জনসাধারণের চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। জ্বর, শ্বাসকষ্ট আর বুকে ব্যথার উপসর্গ নিয়ে কোভিড-১৯ নামের যে ভাইরাসটি ২০১৯ এর ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশ করেছিল চিনের উহান প্রদেশে, এখন তা সারা পৃথিবীর ২১০টি দেশে ছড়িয়েছে। আজকের দিন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২২ লক্ষ মানুষ, যার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৯৫০ জন।

 

সংক্রমণ কমাতে দেশে দেশে চলছে লকডাউন। বর্তমানে ইউরোপ আর আমেরিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ। আমেরিকায় এ পর্যন্ত মারা গেছে ৩৪ হাজার ৪৭৫ জন। প্রতিদিন বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। মানুষ এখন পরিণত হয়েছে সংখ্যাতে। মানুষের মৃত্যুর সংবাদ আর তেমন কোনো প্রভাব ফেলছে না মনের ভেতর। যেন এটাই নিয়তি। যে বাঁচে, যে মরে।

 

সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ লোক চাকরি হারিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের। সারাবিশ্ব হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায়। এরই মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অর্থ সহায়তা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে অযৌক্তিক অজুহাতে।

 

পৃথিবীর সব মানুষের ব্যস্ততা এক নিমিশে স্থবিরতায় পরিণত হয়েছে। বাসায় একরকম গৃহবন্দী জীবনযাপন করছি। ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই চেক করি আজকের ‘সংখ্যা’। কতজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলো, কতজন মিটিয়ে দিলো জীবনের সব লেনদেন। ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন চলার কথা, কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দিন বাড়বে। এরই মধ্যে প্রতিবেশি দেশ ভারত ৩ মে পর্যন্ত লকডাউন বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লন্ডনে আরও তিন সপ্তাহ থাকবে লকডাউন।

 

আজ একদিনে সর্বোচ্চ ৩৪১জন করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে দেশে। মোট মৃতের সংখ্যা ৬০ যার ১০ জন মারা গেছে গত ২৪ঘন্টায়। সুতরাং এখন লকডাউন তুলে নেয়াটা অযৌক্তিক। অবশ্য এর অন্যপিঠে যে প্রশ্নটা আছে তা হলো – এভাবে কতোদিন? এই হতদরিদ্র দেশে কতদিন মানুষ কর্মহীন হয়ে বসে থাকবে? ক্ষুধা নাকি করোনাভাইরাস – কোনটা আগে কেড়ে নেবে মানুষের প্রাণ?

 

উন্নত দেশসহ সব দেশের বিজ্ঞানীরা উঠে পড়ে লেগেছেন করোনার চিকিৎসা উদ্ভাবনের। এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রায় ১৮ মাসের মতো সময় লাগবে করোনার কার্যকরী প্রতিষেধক হাতে পেতে।

 

সভ্যতার প্রভূত অগ্রগতিও ঠেকাতে পারছে না মৃত্যুর মিছিল। অর্থনীতি বাঁচাতে কিছু কিছু দেশ শিথিল করতে চাইছে লকডাউন অবস্থা। সবমিলিয়ে অনিশ্চিত একটা দিকে যাত্রা করেছে সমগ্র পৃথিবী।

 

 

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার 

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন যে সরকার প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান করবে অর্থনীতিকে সচল রাখতে।

 

এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গাতে হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। রেশন কার্ডের ব্যবস্থা হচ্ছে বলে আশ্বাস পাওয়া গেছে। একই সাথে এটাও জেনে রাখা ভালো যে, এরই মধ্যে গরিবের খাদ্য চুরি করে ধরা পড়েছেন দলীয় নেতাকর্মী, চেয়ারম্যানসহ অনেকে। একজনের বক্সখাটের ভেতর পাওয়া গেছে ১২৩৮ লিটার সয়াবিন তেল। এক আওয়ামীলীগ নেতার বাড়িতে পাওয়া গেছে ত্রানের ১৮৪ বস্তা চাল। এছাড়া শুধু জামালপুরেই চুরি হয়েছে ৩৩ হাজার কেজি চাল।

 

প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা থাকলেও এই একলক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনার কতটুকু যে সত্যিই মানুষের কাজে আসবে, আর কতোটা মানুষেরই মতো দেখতে কিছু শকুনের পেটে ঢুকবে তা ভেবে শঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে বৈকি।

 

এছাড়া এই মহামারির সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন, তারাও আছেন নানা দুশ্চিন্তায়। অনেক বাড়িওয়ালা তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাচ্ছেন। এদিকে কর্মক্ষেত্রেও তাদের নেই গুণগত মানসম্পন্ন নিরাপত্তা সরঞ্জাম। আইইডিসিআরের ৬ কর্মী করোনায় আক্রান্ত, সেব্রিনা ফ্লোরাসহ সব কর্মকর্তা কোয়ারেন্টিনে। গত কয়েকদিনে দুজন চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে।

 

 

মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন

 

বাংলাদেশের মানুষেরা পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রাণি। এতো স্ববিরোধিতা অন্য কোনো দেশের মানুষের মধ্যে আছে কিনা জানিনা। এই করোনাকালীন সময়ে মানুষের চরিত্রের এমন অনেক ভয়াবহ দিক ফুটে উঠছে যার সাথে আমরা পরিচিত নই। মুখ থেকে খসে পড়ছে মুখোশ। অন্ধকার দিকটা প্রকাশ হয়ে পড়ছে সকলের সামনে।

 

এ দেশের মানুষেরা ফেসবুকের একনিষ্ঠ ব্যবহারকারী হওয়াতে সত্যের চেয়ে গুজব হয়ে উঠেছে মুখরোচক। হঠাৎ গুজব উঠলো কে যেন স্বপ্ন দেখেছে, থানকুনি পাতা খেলে করোনা ভাইরাস সেরে যাবে। ব্যস! অমনি রাতের আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়লো মানুষ। উন্মাদের মতো খোঁজা শুরু করলো থানকুনি পাতা।

 

কেউ বলল, এটা বিধর্মিদের প্রতি আল্লাহর গজব, এতে মুসলমানদের কিছু হবে না। আর এখন অবস্থা এমন যে মক্কা-মদিনাতে পর্যন্ত মসজিদে নামায পড়া নিষিদ্ধ। পবিত্র কাবা শরীফের পাশে নেই মানুষের ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি। একই ভাবে বন্ধ মন্দির, গির্জাসহ অন্যান্য উপাসনালয়। করোনাভাইরাস সব ধর্মের মধ্যে সমতাবিধান করে দিয়েছে। এবার তাহলে তথাকথিত ধার্মিকেদের বক্তব্য কী?

 

সভ্য দেশে যে কোনো দুর্যোগ মহামারিতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবসামগ্রীর দাম কমিয়ে দেয়া হয়। অথচ এখন চাল ডাল থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম উর্ধ্বমুখি। এদিকে ২৫ এপ্রিল থেকে রমজান মাস শুরু হবে। ব্যবসায়ীদের মনোজগতে কি ধরণের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন? আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কি? আসবে, তবে সেটা মজুতদারীর ধান্দা আর মূল্যবৃদ্ধি করার ফিকির।

 

পত্রিকায় এসেছে যে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে বা করোনায় মৃত্যুবরণ করলে তার দাফনের ব্যবস্থা করতেও রাজী হচ্ছে না প্রতিবেশি বা গ্রামবাসীরা। অনেকক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর জনপ্রতিনিধিরা মিলে কোনো রকমে সম্পন্ন করছেন দাফনের কাজ। সাতক্ষীরায় করোনা হয়েছে সন্দেহে এক নারীকে গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

 

টাংগাইলের সখিপুরে এক ব্যক্তি তার বৃদ্ধ মাকে রাতের আঁধারে জঙ্গলে ফেলে আসে। অবশ্য পরে সে বলেছে তার মা নাকি মানসিক রোগী এবং বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন কিছুদিন আগে।

 

এতসবের মধ্যে আবার ফেনীতে টুটুল নামের এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে তার স্ত্রীকে হত্যা করে পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছেন। কি অদ্ভুত !

 

মানুষের মনোজগতের কি চমৎকার পরিবর্তন!

 

করোনাকালীন ও করোনা পরবর্তী সময়ে এদেশের মানুষের আরো নানারকম মানসিক পরিবর্তন হবে। তবে তার কোনোটাই যে ভালো কিছু নয় তা হলফ করে বলা যায়। উন্নত দেশের মানুষের মনে কি পরিবর্তন হবে জানিনা, তবে এই ঘনবসতিপূর্ণ রামছাগলের দেশে মানুষ আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর হয়ে উঠবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

 

কি মনে হয়?  

 

আপনি আমি এ যাত্রায় ছাড় পেয়ে যাবো তো? নাকি সব যুক্তি-তর্ক ফেলে পাড়ি দেব না ফেরার দেশে?

 

Leave a Reply