‘ বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে
কার ছোঁয়া লাগে যেন মনবীণার তারে
কি যেন সে খুঁজে মরে আকাশ পারে… ‘

 

ইউটিউব ঘাটতে ঘাটতে হুট করে শৈশব ফিরে এলো। মাঝে মাঝে এমন হয়, কোনো একটা গান বা কবিতার পঙক্তি মুহূর্তেই অনেক দূরে নিয়ে যায়। ফেলে আসা দিনগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তেমনি হঠাৎ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের এই গানটা  আজ শৈশবে নিয়ে গেল আমাকে।

 

তখন আমি খুব ছোট, ক্লাস টু’তে ভর্তি হব। খুব সম্ভবত ১৯৯৫/৯৬ সাল। আব্বার চাকরির সুবাদে যশোর আরবপুরে থাকি। আব্বা তখন বিমান বাহিনীর ফিল্ড ইউনিটে পোস্টিং। আমরা গ্রাম থেকে কিছুদিন হলো যশোরে এসেছি। আরবপুর দিঘীরপাড়ের এদিকে একটা বাড়িতে বাসা ভাড়া করে থাকি। ছোটবোন তানিয়া তখন অনেক ছোট, স্কুলে যায় না। রাতে আব্বা আমাকে ইংরেজি ওয়ার্ডবুকের বই খুলে পড়ান, আর পড়ানোর চেয়ে বেশি ধমক দেন। এর কিছুদিন পরেই আমি গুলশান প্রিক্যাডেট স্কুলে ভর্তি হই।

 

সে স্কুলে আমার কিছু ভালো বন্ধু হয়। একজনের নাম ছিলো রোমান। এছাড়া বনির কথাও মনে আছে। বনির রোল ছিল এক। তখন স্কুলে গানের ক্লাস হতো। টিচার হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শেখাতেন। আমরা সমবেতভাবে গান গাইতাম। টিফিনে দৌড়াদৌড়ি করতাম স্কুলের পাশের খোলা জায়গায়। আব্বা তার সাইকেলের সামনে করে আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। ফেরার পথে আরবপুর মোড়ের দোকান থেকে কেক কিনে দিতেন। যেতে-আসতে সাইকেল চালাতে চালাতেই নানারকম উপদেশ দিতেন। বন্ধুদের মধ্যে রোমানের সাথেই আমার সবচেয়ে খাতির ছিল। একবার তো ওদের বাড়িতে গিয়ে থেকেও ছিলাম একদিন। সেসব স্মৃতি অস্পষ্ট এখন। বিস্মৃত রূপকথার মতো আবছা আবছা মনে আছে। আমি বরাবরই ভুলোমনের মানুষ।

 

আব্বার ফিল্ড ইউনিট অফিসের পাশে এক মস্ত দিঘী ছিল। সেখানে মাছ ধরলে আব্বা প্রায়ই মাছ নিয়ে আসতেন। একবার অনেক বড় একটা হলুদ রঙের কার্প মাছ কিনে এনেছিলেন। অনেক ডিম হয়েছিল সেটার পেটে। মাছ আর ডিম খাওয়ার জন্য আমাকে অনেক বললেও আমি খাইনি। ইলিশ মাছ ছাড়া অন্য মাছ আমি খেতে পারতাম না, এখনো পারিনা। যতদূর মনে পড়ে আমি বেশ শান্তশিষ্ট ছিলাম ছোটবেলায়। শুধু কাকা বেড়াতে আসলে আনন্দে লাফালাফি করতাম। একবার আনন্দে লাফাতে লাফাতে, জানালার গ্রিলে মাথা লেগে চোখের উপরে অনেকটা কেটে গিয়েছিল।

 

ছোটবেলায় অনেক ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ পেতাম। যেমন আব্বা অফিস থেকে ফিরলে আমি আর তানিয়া আব্বাকে দেখে ‘আব্বু, আব্বু’ বলে লাফাতাম। আব্বা অফিস থেকে আসার সময় আমাদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। তানিয়া ছোটবেলায় দেখতে খুব গোলগাল আর কিউট ছিল। পাশের বাসার আংকেল ওর জন্য প্রায়ই চিপস কিনে আনতেন। বোম্বে সুইটস এর পটেটো চিপস। কখনো রিং চিপস। আমরা আঙ্গুলে আঙটি হিসেবে পরতাম আর কড়মড় করে খেতাম সেসব।

 

তখন আমাদের বাসায় কোনো টিভি ছিলো না। আমরা পাশের আন্টিদের বাসায় গিয়ে আলিফ লায়লা দেখতাম। যেদিন আলিফ-লায়লা হতো কিংবা শুক্রবার দিন ছবি শুরু হলে, তাদের বাসায় ভিড় হয়ে যেত। একসময় আমাদের ঠেকাতে আব্বা একটা সাদাকালো টিভি কিনলেন, ফিলিপস কোম্পানির। তখন তো একটাই চ্যানেল ছিল, বিটিভি। সেই টিভিতে ছবি ক্লিয়ার করতে হলে বাঁশের মাথায় এন্টেনা ঘোরাতে হতো। আব্বা বাইরে গিয়ে এন্টেনা ঘোরাতেন, আর আমরা ঘর থেকে চিৎকার দিয়ে বলতাম,  হইছে… হইছে… না … না… আবার ঝিরঝির…। শুক্রবারে ছবি দেখতে দেখতে অনেকদিন হুট করে কারেন্ট চলে যেত। সবাই হায় হায় করে উঠতাম। তখন শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউই তেমন বাইরে থাকতো না। সবাই টিভির সামনে বসে বাংলা ছবি দেখতো। বেশি দুঃখের ছবি হলে আমি দেখতে পারতাম না। মনখারাপ করে কান্না আসতো। বিশেষ করে কম বয়সে নায়কের বাবা মারা গেলে, আমি তা দেখতাম না। কাথা মুড়ি দিয়ে চুপ করে খাটের কোণে শুয়ে থাকতাম। খারাপ দৃশ্য শেষ হলে আম্মা আমাকে বলতেন, তখন আবার চোখ মেলতাম। তখন থেকেই শুক্রবার দিনটা আমার ভালো লাগতো না। এখনো লাগে না।

 

আম্মা প্রতিদিন আমাদের দুই ভাইবোনকে একসাথে গোসল করাতেন। বাসার সামনে উঠানের একপাশে ছিল কলপাড়। টিউবওয়েলে চাপ দিয়ে পানি তুলে বালতিতে করে আম্মা আমাদের গোসল করিয়ে দিতেন। গা ডলে ডলে এভাবে গোসল করাটা একটা যুদ্ধের মতো, আম্মাকে অনেক বেগ পেতে হতো। আমাদের খুব অপছন্দ ছিলো এটা। গোসলের সময় হলেই পালাই পালাই করতাম।

 

এসময় সবাই রাত ৮ টার সংবাদ শুনতো। খবর শুরু হওয়ার আওয়াজ শুনলেই সবাই টিভির সামনে। গভীর আগ্রহে সবাই একদম চুপচাপ থেকে রাত আটটার খবর শুনতো। বিটিভির রাত আটটার সংবাদ… টুট…টুট…টু…

 

বিটিভিতে নানারকম গানের অনুষ্ঠানও হতো। তখন আধুনিক গান বলতে সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লার গান। আমার ভালো লাগতো না এসব। তার চেয়ে খুরশীদ আলমের দেশের গান ভালো লাগত। আর ভালো লাগত মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, কিংবা ভুপেন হাজারিকার গান। এছাড়া নজরুল আর রবীন্দ্রসঙ্গীত।  তখন তো নাম জানতাম না সব ঠিকঠাক মতো। কিন্তু গানগুলো শুনে নতুন এক জগতে চলে যেতাম। সুর আর ছন্দে মন ভরে উঠতো। অনেকসময় রাত দশটার ইংরেজি সংবাদের পর শুরু হতো এইসব সোনালি দিনের গান। তখন তো রাত দশটা মানেই ঘুমানোর আয়োজন। আটটার সংবাদ দেখে ভাত খেয়ে রাত দশটার ইংরেজি সংবাদ শুরুর সাথে সাথে মশারি টানানো হয়ে যেত। শুধুমাত্র যেদিন ইত্যাদি হতো, সেদিনই আমরা বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকতাম। বেশি রাত মানে সর্বোচ্চ রাত এগারোটা।

 

তখনই শুনেছি কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আমি এতো যে তোমায় ভালোবেসেছি, লোকে বলে রাগ নাকি অনুরাগের আয়না, চন্দন পালঙ্কে শুয়ে একা একা কি হবে, আমি আকৃতি অধম, – এমনি কতো অসাধারণ গান।

 

আজ হঠাৎ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে’ গানটা ইউটিউবে শুনতে শুনতে সেই পুরনো দিনগুলোর গন্ধ নাকে এসে লাগলো।  ফেলে আসা দিনগুলো কেন এতো আপন মনে হয়? কেন সেসব দিনের কথা মনে পড়লে একটা শীতল আবেশ ছড়িয়ে যায় মনে? কে জানে !

 

‘ বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে,
বারে বারে কে যেন ডাকে

কার ছোঁয়া লাগে যেন মনোবীণার তারে
কার ছোঁয়া লাগে যেন মনোবীণার তারে
কি যেন সে খুঁজে মরে আকাশ পারে

বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে,
বারে বারে কে যেন ডাকে… ‘

Leave a Reply